ঢাকা ০৭:৪২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ইরানে আরও ৫০৮ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে কী? Logo বাংলাদেশ-জাপান ৬ চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি Logo যুক্তরাষ্ট্রকে শিক্ষা দিতে যুদ্ধের মূল্য চুকানোর হুঁশিয়ারি ইরানের Logo আইসিসিবিতে শুরু হলো পাঁচ দিনব্যাপী দেশীয় ফার্নিচার মেলা Logo অনিশ্চয়তায় সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম তৈরি, অর্থাভাবে ধুঁকছে গবেষণাকেন্দ্র Logo চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিক পাচার Logo জাপানের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে পোস্টে যা বললেন Logo সমুদ্রবন্দর ও শিল্প পার্ক নির্মাণে পিপিপি মডেল চায় সোজিৎজ ও এনার্জিপ্যাক Logo বিশ্ব জ্বালানির রূপান্তর পারমাণবিক শক্তিকে ছাড়াল বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ Logo পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৬.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান

ঢাকায় মাদকের ১৮ হাব ধরাছোঁয়ার আড়ালে ৩৬৩ কারবারি

  • TV Today HD Desk:
  • আপডেট : ১০:৩৯:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
  • ৩৯ Time View

ঢাকায় মাদকের ১৮ হাব ধরাছোঁয়ার আড়ালে ৩৬৩ কারবারি

মাদক স্পটগুলোতে অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ, চিহ্নিত গডফাদাররা আড়ালে 

শেখ নূর ইসলাম:

প্রকাশ্যে চলে মাদক বিক্রি। ২০ টাকায় মেলে সেবনের নিরাপদ জায়গাও। স্থানীয় এলাকাবাসী ও মাদকসেবীদের কাছে এসব ঘর পরিচিত ‘গাপ্পা’ নামে। ঘরগুলোর আশেপাশে লাঠি, চাপাতি, ছ্যান, ও অন্যান্য ধারালো সব অস্ত্র হাতে পাহারায় থাকে মাদক কারবারিদের লোকজন। সম্প্রতি সাবেক সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী অভিযানের পর নতুন করে আলোচনায় আসে রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকা। সেখানের একটি এলাকা ঘুণ্টিঘর; যেখানে দিনের বেলায় রেললাইনের দুই পাশে দেদারছে চলে মাদকের বেচাকেনা। এখানে মাদক বিক্রি ও সেবন ওপেন সিক্রেট।

সূর্য ওঠে এখানে অন্যরূপে! প্রতিদিন সকাল থেকেই স্কুলশিক্ষার্থী থেকে রিকশাওয়ালা ও চাকরিজীবী সবারই আনাগোনা বাড়ে ঘুণ্টিঘর এলাকায়। শুধু তাই নয়, গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবার মতো মাদক বিক্রির পাশাপাশি সেখানে সেবনের নিরাপদ ব্যবস্থাও রেখেছে কারবারিরা। টাকা দিলে মিলছে মাদক, সে সাথে ২০ টাকায় সেবনের জায়গাও। স্থানীয় ইমরান , নাজির ও ফারুকের দাবি, প্রয়োজনে মাদক ক্রেতার নিরাপত্তার জন্যে  নির্দিষ্ট দূরে পর্যন্ত মাদক এগিয়ে দেয় নির্বিঘ্নে।

সেখানে খোজখবর নিয়ে স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা গেছে, মানবতার আশ্রয় বলে মনে করে রেল লাইনের দুই পাশে গড়ে ওঠা ছোট ছোট ঘুপড়িঘরে মানবতা নয়; শুধুই প্রহসন! সেখানে মাদক ভেদে আলাদা টাকায় সেবনের ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদকসেবীদের কাছে এসব ঘর ‘গাপ্পা’ নামে পরিচিত। ঘরগুলোর আশেপাশে লাঠি, চাপাতি, চ্যান ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র হাতে পাহারায় থাকে মাদক কারবারিদের লোকজন। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতার ওপরও নজরদারি রাখেন তারা। রাত যত গভীর হয় ঘুণ্টিঘর হয়ে ওঠে ততই জমজমাট। তবে রাজধানীতে মাদক কারবারে হটস্পট শুধু এই একটি ঘুণ্টিঘর নয়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঘুণ্টিঘরের মতোই আরও অন্তত ১৭টি মাদকের হটস্পট রয়েছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। যেখানে কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়া প্রশাসনের চোখের সামনেই দেদার বিক্রি হয় গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইনসহ নিত্যনতুন মাদক।

এমনকি কোথাও কোথাও ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের মতো ভয়ংকর মাদকদ্রব্যও বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে বসে। পূর্বে লিখেছি, নিরাপদে সেবন করার জন্য আলাদা টাকাও নিচ্ছে চক্র।

এদিকে গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর প্রকাশ্যে আসার পর কারবারি গ্রেপ্তারে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুরু হয়েছে মাদকের হটস্পট চিহ্নিতের কাজ। জোরদার করা হয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। ঢাকায় মাদকের কোনো হটস্পটের অস্তিত্ব রাখা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ডিবি পুলিশ।

তবে অস্ত্র ও জনবল সংকটে একক অভিযানে ঘুণ্টিঘরের মতো স্পটগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা নিজেদের জন্য হুমকি বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা। তাঁরা নতুন কৌশলে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা শুরু করেছেন। যেকোনোভাবেই মাদক সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে চায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। অন্যদিকে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা জানিয়ে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু বিশেষ অভিযানটির কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও এখনো ৩ শতাধিক কারবারি ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।

ঢাকা মহানগর এলাকায় পুলিশের (ডিএমপি) হালনাগাদ একটি তালিকায় মহানগরীর ৫০ থানায় ৩৬৩ জন সক্রিয় মাদক কারবারির নাম রয়েছে। গত মার্চের দিকে তৈরি করা তালিকায় ঘুন্টিঘর এলাকার মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে রহিমা নামে এক নারীর নাম তালিকায় উঠে আসে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধু গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর ও পার্শ্ববর্তী মুন্সিরটেক নয়-রাজধানীজুড়েই রয়েছে এরকম আরও বেশ কয়েকটি হটস্পট। যেখানে মাদক ক্রয়-বিক্রয় ও সেবন ওপেন সিক্রেট। প্রাণভয়ে প্রতিবাদ করেন না এসব এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা। কারণ প্রতিবাদ করলেই তাদের ওপর হামলা করে বসে কারবারিরা। এমনকি গুলি করতেও দ্বিধা করে না কারবারির সদস্যরা।

ঢাকা মহানগর এলাকায় মাদক স্পটের মধ্যে অন্যতম:

সম্প্রতি ঘুন্টিঘরের নাম প্রকাশ্যে এসেছে কিন্তু না, ঘুণ্টিঘরের মতো অন্যতম স্পট হচ্ছে সবুজবাগের ওহাব কলোনি, কড়াইল বস্তি, পল্লবীর জেনেভা ক্যাম্প, শাহআলী মাজার, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, ভাটারা বালুর মাঠ, কারওয়ান বাজার থেকে নাখালপাড়া রেললাইন, হাজারীবাগের গণকটুলি সিটি কলোনি, উত্তরা রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশ এলাকা, কোতোয়ালি সুইপার কলোনি, স্বামীবাগ রেললাইন, লালবাগের শহীদনগরের ৪ ও ৫ নম্বর গলি, ডেমরা সারুলিয়া নদীরপাড়, শ্যামপুর আইজি গেট বস্তি, কদমতলীর ওয়াসা রেলগেট, শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি ও কাফরুল কাঁঠাল মাঠ এলাকা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কারওয়ানবাজার-নাখালপাড়া রেললাইন এলাকা আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে মাদক বিক্রি ও সেবনের হটস্পট হিসেবে। গত সোমবার সন্ধ্যার পর এফডিসি রেলগেট যেতেই দেখা যায় ভবঘুরে তিন কিশোর কাগজে মোড়া গাঁজার পুঁটলি পলিথিনে ভরে ছোটাছুটি করছে। সেখানে যাতায়াতকারী লোকদের বলছে- ১০০ না ২০০। লাগবে নাকি সিদ্ধি? অনেকে তাদের কাছ থেকে কিনেও নিচ্ছে। শুধু রেলগেট নয়, এফডিসি রেলগেট থেকে তেঁজগাও রেলগেট পর্যন্ত বিস্তৃত মাদকের বাজার। এই এলাকায় রেললাইনের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকে বিক্রেতারা। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কয়ডা-কয়ডা বলে হাঁক দেন। ক্রেতারা টাকা হাতে দাঁড়ালেই বের করে দেন গাঁজা, ইয়াবা। কেউ কেউ রেললাইনের পাথরের নিচে লুকিয়ে রাখেন মাদক। গ্রাহক এলে বের করে বিক্রি করে মুহূর্তের  মধ্যে কিছুটা দূরে গিয়ে নতুন ক্রেতা খুঁজতে থাকেন।

গলার কাটাখ্যাত রাজধানীর অন্যতম মাদক স্পট মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। এখানকার কয়েকজন শীর্ষ কারবারি গ্রেপ্তার হলেও এক দিনের জন্যও থামানো যায়নি মাদকের কারবার। ক্যাম্পের মুরগিপট্টি, বাবর রোড, আল ফালাহ মডেল ক্লিনিক গলি, হুমায়ুন রোডসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত চলে মাদক বিক্রি ও সেবন। ক্যাম্প এলাকায় ঢুকলেই নারী-শিশুদের হাতে ইয়াবা ও হেরোইন দেখা মেলে। অপরিচিত কেউ ক্যাম্প এলাকায় প্রবেশ করলে নজরদারিও করেন কারবারি চক্রের সদস্যরা।

এদিকে পল্লবীর এডিসি ক্যাম্প, কেটিসি ক্যাম্প, রহমত ক্যাম্প, মাদ্রাসা ক্যাম্প, মুসলিম ক্যাম্প, কনসাল ক্যাম্প, থার্টিনাস ক্যাম্প, কালাপানি বস্তি, কুর্মিটোলা ক্যাম্প, মুড়াপাড়া ক্যাম্প, এমসিসি ক্যাম্প, মিল্লাত ক্যাম্প, শাহপরান ক্যাম্পও মাদকের অন্যতম হাব। ফোর স্টার গ্রুপের ছত্রছাঁয়ায় কারবারিরা এসব ক্যাম্পে মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।

অনুসন্ধান ও প্রাপ্ত তথ্য বলছে, পল্লবীতে মাদকের কলকাঠি নাড়ছে রাজিয়া বেগম, ফতেহ, লাভলী বেগম, নাদিম, জুম্মন, হালিমা, সাহাজামান, বট রনি, আফসানা, রুমা, রজনী আক্তার ও শাহিনুর বেগম।

মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে গলাকাটা মনু, চোর জানু ওরফে জানে আলম, সারফু আরমান, তাজ, আনোয়ার হোসেন কাল্লু, চাপাই আরিফ, সিডি স্বপন।

গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে রহিমা, মনিরুল হক রবিন, মিনু, স্বামীবাগ রেললাইনে আমির হোসেন,

কড়াইল বস্তির মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে জিল্লুর রহমান, এরশাদ মিয়া, টোকাই আনোয়ার, লিটন, বরিশাইল্লা নাসির, মিজানুর রহমান, আইলশা মনির, ঘাড় কাটা বাবুল ও রনি।

সবুজবাগ ওহাব কলোনির মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে ফর্মা বাবুল, মো. শামীম, আশিকুর রহমান শান্ত, সুফিয়া ও তার মেয়ে তানিয়া বেগম।

শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি নিয়ন্ত্রণ করছে হারিছ মিয়া, সজল হোসেন, শাওন চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন, মানিক ও কানা সোহেল।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণির সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে মাদকের হটস্পটগুলোর নতুন তালিকা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জোরদার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

মো. শফিকুল ইসলাম ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) জানান, ডিএমপি সবসময় মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ঘুণ্টিঘর (গেন্ডারিয়া) থেকে গত ৬ মাসে ৫ শতাধিক মাদক সেবনকারী ও বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর পরও এখানে মাদকের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। এই ঘুণ্টিঘরসহ এরকম যতগুলো হটস্পট ঢাকায় রয়েছে সেগুলোর কোনোটির অস্তিত্ব রাখা হবে না।

ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ঘুণ্টিঘরের মতো স্পটে ডিএনসির একার পক্ষে অভিযান পরিচালনা করা ঝুঁকি। এজন্য অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় সমন্বিত অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ঘুণ্টিঘরের পর ওহাব কলোনিতেও আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। ভাটারা বালুর মাঠেও অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সেখানে আপাতত মাদক কারবার বন্ধ রয়েছে জানার পর অভিযান স্থগিত রাখা হয়।

ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ের ডিডি মো. রাজিউর রহমান বলেন, কড়াইল বস্তি থেকে আট শীর্ষ কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও শীর্ষ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আমাদের পরবর্তী টার্গেট মিরপুর এলাকা। এরপর ধাপে ধাপে অন্য এলাকাতেও অভিযান পরিচালনা করা হবে।

–টিভি টুডে

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে আরও ৫০৮ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে কী?

ঢাকায় মাদকের ১৮ হাব ধরাছোঁয়ার আড়ালে ৩৬৩ কারবারি

আপডেট : ১০:৩৯:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকায় মাদকের ১৮ হাব ধরাছোঁয়ার আড়ালে ৩৬৩ কারবারি

মাদক স্পটগুলোতে অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ, চিহ্নিত গডফাদাররা আড়ালে 

শেখ নূর ইসলাম:

প্রকাশ্যে চলে মাদক বিক্রি। ২০ টাকায় মেলে সেবনের নিরাপদ জায়গাও। স্থানীয় এলাকাবাসী ও মাদকসেবীদের কাছে এসব ঘর পরিচিত ‘গাপ্পা’ নামে। ঘরগুলোর আশেপাশে লাঠি, চাপাতি, ছ্যান, ও অন্যান্য ধারালো সব অস্ত্র হাতে পাহারায় থাকে মাদক কারবারিদের লোকজন। সম্প্রতি সাবেক সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী অভিযানের পর নতুন করে আলোচনায় আসে রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকা। সেখানের একটি এলাকা ঘুণ্টিঘর; যেখানে দিনের বেলায় রেললাইনের দুই পাশে দেদারছে চলে মাদকের বেচাকেনা। এখানে মাদক বিক্রি ও সেবন ওপেন সিক্রেট।

সূর্য ওঠে এখানে অন্যরূপে! প্রতিদিন সকাল থেকেই স্কুলশিক্ষার্থী থেকে রিকশাওয়ালা ও চাকরিজীবী সবারই আনাগোনা বাড়ে ঘুণ্টিঘর এলাকায়। শুধু তাই নয়, গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবার মতো মাদক বিক্রির পাশাপাশি সেখানে সেবনের নিরাপদ ব্যবস্থাও রেখেছে কারবারিরা। টাকা দিলে মিলছে মাদক, সে সাথে ২০ টাকায় সেবনের জায়গাও। স্থানীয় ইমরান , নাজির ও ফারুকের দাবি, প্রয়োজনে মাদক ক্রেতার নিরাপত্তার জন্যে  নির্দিষ্ট দূরে পর্যন্ত মাদক এগিয়ে দেয় নির্বিঘ্নে।

সেখানে খোজখবর নিয়ে স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা গেছে, মানবতার আশ্রয় বলে মনে করে রেল লাইনের দুই পাশে গড়ে ওঠা ছোট ছোট ঘুপড়িঘরে মানবতা নয়; শুধুই প্রহসন! সেখানে মাদক ভেদে আলাদা টাকায় সেবনের ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদকসেবীদের কাছে এসব ঘর ‘গাপ্পা’ নামে পরিচিত। ঘরগুলোর আশেপাশে লাঠি, চাপাতি, চ্যান ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র হাতে পাহারায় থাকে মাদক কারবারিদের লোকজন। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতার ওপরও নজরদারি রাখেন তারা। রাত যত গভীর হয় ঘুণ্টিঘর হয়ে ওঠে ততই জমজমাট। তবে রাজধানীতে মাদক কারবারে হটস্পট শুধু এই একটি ঘুণ্টিঘর নয়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঘুণ্টিঘরের মতোই আরও অন্তত ১৭টি মাদকের হটস্পট রয়েছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। যেখানে কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়া প্রশাসনের চোখের সামনেই দেদার বিক্রি হয় গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইনসহ নিত্যনতুন মাদক।

এমনকি কোথাও কোথাও ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের মতো ভয়ংকর মাদকদ্রব্যও বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে বসে। পূর্বে লিখেছি, নিরাপদে সেবন করার জন্য আলাদা টাকাও নিচ্ছে চক্র।

এদিকে গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর প্রকাশ্যে আসার পর কারবারি গ্রেপ্তারে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুরু হয়েছে মাদকের হটস্পট চিহ্নিতের কাজ। জোরদার করা হয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। ঢাকায় মাদকের কোনো হটস্পটের অস্তিত্ব রাখা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ডিবি পুলিশ।

তবে অস্ত্র ও জনবল সংকটে একক অভিযানে ঘুণ্টিঘরের মতো স্পটগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা নিজেদের জন্য হুমকি বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা। তাঁরা নতুন কৌশলে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা শুরু করেছেন। যেকোনোভাবেই মাদক সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে চায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। অন্যদিকে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা জানিয়ে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু বিশেষ অভিযানটির কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও এখনো ৩ শতাধিক কারবারি ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।

ঢাকা মহানগর এলাকায় পুলিশের (ডিএমপি) হালনাগাদ একটি তালিকায় মহানগরীর ৫০ থানায় ৩৬৩ জন সক্রিয় মাদক কারবারির নাম রয়েছে। গত মার্চের দিকে তৈরি করা তালিকায় ঘুন্টিঘর এলাকার মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে রহিমা নামে এক নারীর নাম তালিকায় উঠে আসে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধু গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর ও পার্শ্ববর্তী মুন্সিরটেক নয়-রাজধানীজুড়েই রয়েছে এরকম আরও বেশ কয়েকটি হটস্পট। যেখানে মাদক ক্রয়-বিক্রয় ও সেবন ওপেন সিক্রেট। প্রাণভয়ে প্রতিবাদ করেন না এসব এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা। কারণ প্রতিবাদ করলেই তাদের ওপর হামলা করে বসে কারবারিরা। এমনকি গুলি করতেও দ্বিধা করে না কারবারির সদস্যরা।

ঢাকা মহানগর এলাকায় মাদক স্পটের মধ্যে অন্যতম:

সম্প্রতি ঘুন্টিঘরের নাম প্রকাশ্যে এসেছে কিন্তু না, ঘুণ্টিঘরের মতো অন্যতম স্পট হচ্ছে সবুজবাগের ওহাব কলোনি, কড়াইল বস্তি, পল্লবীর জেনেভা ক্যাম্প, শাহআলী মাজার, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, ভাটারা বালুর মাঠ, কারওয়ান বাজার থেকে নাখালপাড়া রেললাইন, হাজারীবাগের গণকটুলি সিটি কলোনি, উত্তরা রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশ এলাকা, কোতোয়ালি সুইপার কলোনি, স্বামীবাগ রেললাইন, লালবাগের শহীদনগরের ৪ ও ৫ নম্বর গলি, ডেমরা সারুলিয়া নদীরপাড়, শ্যামপুর আইজি গেট বস্তি, কদমতলীর ওয়াসা রেলগেট, শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি ও কাফরুল কাঁঠাল মাঠ এলাকা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কারওয়ানবাজার-নাখালপাড়া রেললাইন এলাকা আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে মাদক বিক্রি ও সেবনের হটস্পট হিসেবে। গত সোমবার সন্ধ্যার পর এফডিসি রেলগেট যেতেই দেখা যায় ভবঘুরে তিন কিশোর কাগজে মোড়া গাঁজার পুঁটলি পলিথিনে ভরে ছোটাছুটি করছে। সেখানে যাতায়াতকারী লোকদের বলছে- ১০০ না ২০০। লাগবে নাকি সিদ্ধি? অনেকে তাদের কাছ থেকে কিনেও নিচ্ছে। শুধু রেলগেট নয়, এফডিসি রেলগেট থেকে তেঁজগাও রেলগেট পর্যন্ত বিস্তৃত মাদকের বাজার। এই এলাকায় রেললাইনের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকে বিক্রেতারা। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কয়ডা-কয়ডা বলে হাঁক দেন। ক্রেতারা টাকা হাতে দাঁড়ালেই বের করে দেন গাঁজা, ইয়াবা। কেউ কেউ রেললাইনের পাথরের নিচে লুকিয়ে রাখেন মাদক। গ্রাহক এলে বের করে বিক্রি করে মুহূর্তের  মধ্যে কিছুটা দূরে গিয়ে নতুন ক্রেতা খুঁজতে থাকেন।

গলার কাটাখ্যাত রাজধানীর অন্যতম মাদক স্পট মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। এখানকার কয়েকজন শীর্ষ কারবারি গ্রেপ্তার হলেও এক দিনের জন্যও থামানো যায়নি মাদকের কারবার। ক্যাম্পের মুরগিপট্টি, বাবর রোড, আল ফালাহ মডেল ক্লিনিক গলি, হুমায়ুন রোডসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত চলে মাদক বিক্রি ও সেবন। ক্যাম্প এলাকায় ঢুকলেই নারী-শিশুদের হাতে ইয়াবা ও হেরোইন দেখা মেলে। অপরিচিত কেউ ক্যাম্প এলাকায় প্রবেশ করলে নজরদারিও করেন কারবারি চক্রের সদস্যরা।

এদিকে পল্লবীর এডিসি ক্যাম্প, কেটিসি ক্যাম্প, রহমত ক্যাম্প, মাদ্রাসা ক্যাম্প, মুসলিম ক্যাম্প, কনসাল ক্যাম্প, থার্টিনাস ক্যাম্প, কালাপানি বস্তি, কুর্মিটোলা ক্যাম্প, মুড়াপাড়া ক্যাম্প, এমসিসি ক্যাম্প, মিল্লাত ক্যাম্প, শাহপরান ক্যাম্পও মাদকের অন্যতম হাব। ফোর স্টার গ্রুপের ছত্রছাঁয়ায় কারবারিরা এসব ক্যাম্পে মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।

অনুসন্ধান ও প্রাপ্ত তথ্য বলছে, পল্লবীতে মাদকের কলকাঠি নাড়ছে রাজিয়া বেগম, ফতেহ, লাভলী বেগম, নাদিম, জুম্মন, হালিমা, সাহাজামান, বট রনি, আফসানা, রুমা, রজনী আক্তার ও শাহিনুর বেগম।

মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে গলাকাটা মনু, চোর জানু ওরফে জানে আলম, সারফু আরমান, তাজ, আনোয়ার হোসেন কাল্লু, চাপাই আরিফ, সিডি স্বপন।

গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে রহিমা, মনিরুল হক রবিন, মিনু, স্বামীবাগ রেললাইনে আমির হোসেন,

কড়াইল বস্তির মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে জিল্লুর রহমান, এরশাদ মিয়া, টোকাই আনোয়ার, লিটন, বরিশাইল্লা নাসির, মিজানুর রহমান, আইলশা মনির, ঘাড় কাটা বাবুল ও রনি।

সবুজবাগ ওহাব কলোনির মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে ফর্মা বাবুল, মো. শামীম, আশিকুর রহমান শান্ত, সুফিয়া ও তার মেয়ে তানিয়া বেগম।

শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি নিয়ন্ত্রণ করছে হারিছ মিয়া, সজল হোসেন, শাওন চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন, মানিক ও কানা সোহেল।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণির সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে মাদকের হটস্পটগুলোর নতুন তালিকা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জোরদার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

মো. শফিকুল ইসলাম ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) জানান, ডিএমপি সবসময় মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ঘুণ্টিঘর (গেন্ডারিয়া) থেকে গত ৬ মাসে ৫ শতাধিক মাদক সেবনকারী ও বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর পরও এখানে মাদকের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। এই ঘুণ্টিঘরসহ এরকম যতগুলো হটস্পট ঢাকায় রয়েছে সেগুলোর কোনোটির অস্তিত্ব রাখা হবে না।

ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ঘুণ্টিঘরের মতো স্পটে ডিএনসির একার পক্ষে অভিযান পরিচালনা করা ঝুঁকি। এজন্য অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় সমন্বিত অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ঘুণ্টিঘরের পর ওহাব কলোনিতেও আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। ভাটারা বালুর মাঠেও অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সেখানে আপাতত মাদক কারবার বন্ধ রয়েছে জানার পর অভিযান স্থগিত রাখা হয়।

ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ের ডিডি মো. রাজিউর রহমান বলেন, কড়াইল বস্তি থেকে আট শীর্ষ কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও শীর্ষ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আমাদের পরবর্তী টার্গেট মিরপুর এলাকা। এরপর ধাপে ধাপে অন্য এলাকাতেও অভিযান পরিচালনা করা হবে।

–টিভি টুডে