ঢাকা ০৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ইরানে আরও ৫০৮ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে কী? Logo বাংলাদেশ-জাপান ৬ চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি Logo যুক্তরাষ্ট্রকে শিক্ষা দিতে যুদ্ধের মূল্য চুকানোর হুঁশিয়ারি ইরানের Logo আইসিসিবিতে শুরু হলো পাঁচ দিনব্যাপী দেশীয় ফার্নিচার মেলা Logo অনিশ্চয়তায় সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম তৈরি, অর্থাভাবে ধুঁকছে গবেষণাকেন্দ্র Logo চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিক পাচার Logo জাপানের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে পোস্টে যা বললেন Logo সমুদ্রবন্দর ও শিল্প পার্ক নির্মাণে পিপিপি মডেল চায় সোজিৎজ ও এনার্জিপ্যাক Logo বিশ্ব জ্বালানির রূপান্তর পারমাণবিক শক্তিকে ছাড়াল বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ Logo পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৬.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান

উচ্চমূল্যের বাজারে ফের নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ

  • TV Today HD Desk:
  • আপডেট : ১২:৫২:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫১ Time View

উচ্চমূল্যের বাজারে ফের নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ

-শেখ নূর ইসলাম

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম বা উচ্চমূল্যের বাজারে নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ বর্তমান সময়ে এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর সমস্যা। আয়ের তুলনায় দৈনন্দিন জীবনে ভোগ্যপণ্যের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন নিম্ন আয়ের কর্মজীবী ও সাধারণ আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। ভোগ্যপণ্য বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা  অস্থিরতায় কোনভাবেই স্বস্তি পাচ্ছে না সাধারণ ক্রেতারা। মূল্যবৃদ্ধির চরম ভোগান্তির মধ্যে নতুন করে বাড়িয়েছে সয়াবিন তেল ও চিনির তীব্র সরবরাহ সংকট। সরকার নির্ধারিত সরবোচ্চ খুচরা মূল্যের তোয়াক্কা না করে বাজারে খোলা ও প্যাকেটজাত- উভয় পণ্যই বিক্রি হচ্ছে ব্যবসায়ীদের মর্জি-মাফিক বাড়তি দামে। সেই সঙ্গে বাড়তিমূল্যে আটকে আছে ডিম, সব্জি ও সাধারণ পণ্যের দাম। ফলে বাজারে এসে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের বাড়ছে হায় হুতাসের দীর্ঘশ্বাস।

পরিবহন খাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে থেকেই বেশি দামে নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে এমনিতেই চাপে আছে সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে নতুন করে বেড়েছে চাল, আটা, ময়দা, ডাল, ভোজ্য তেল, ডিম, দুধ ও বিভিন্ন সবজির দাম। এক মাসের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক বাজার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে সে চিত্র।

বিক্রেতারা এতদিন সরবরাহের সংকটের কথা বললেও ব্যবসায়ীরা এখন নতুন করে বাড়তি পরিবহন ভাড়ার দোহাই দিচ্ছেন। কিন্তু ভোক্তাদের অভিযোগ, পরিবহন ভাড়া বাড়লেও সেই অজুহাতে পণ্যের দাম অতিরিক্ত বাড়ানো হচ্ছে। তারা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে সব পণ্যের দাম বেশি হারে বাড়িয়ে দেওয়া এখন রীতিতে পরিণত হয়েছে। এ প্রবণতা বন্ধে বাজারে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

ভোগ্যপণ্য সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির বাজার চিত্র বলছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর তার প্রভাব বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। এতে বেশ কিছু পণ্যের দাম নতুন করে বেড়েছে। খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা তেমনটাই জানাচ্ছেন। টিসিবির এক মাসের পণ্যমূল্য বিশ্লেষণ বলছে, মাসের ব্যবধানে কেজিপ্রতি মাঝারি চালের দাম ২ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং সরু চালের দাম ১ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়েছে।

তবে বাজারে বেশি বেড়েছে আটা-ময়দার দাম। এ সময় প্যাকেট আটায় ৮ শতাংশ ও প্যাকেট ময়দার কেজিতে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ দাম বেড়েছে। অপরদিকে প্রতি কেজি খোলা আটায় ২ শতাংশ ও ময়দায় ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়েছে। মাসের ব্যবধানে এক লিটারের বোতলে ২ দশমিক ৫১ শতাংশ, দুই লিটারের বোতলে ৩ শতাংশ, পাঁচ লিটারের বোতলে ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ দাম বেড়েছে। খোলা সয়াবিনের লিটারেও ভোক্তার ১ শতাংশ ও পাম তেলে ২ শতাংশ খরচ বেড়েছে।

বাজারে ডালের মধ্যে বড় দানার মশুর ডালের দাম চলতি মাসে কেজিপ্রতি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ দাম বেড়েছে। বেড়েছে ছোলার দামও; ১০ দশমিক ৫২ শতাংশ। ডিমের দাম হালিতে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ দাম বেড়েছে। এ ছাড়া কাঁচাবাজারে বেগুন, শসা ও কাঁচামরিচের দামও ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

শুক্রবার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ডিমের (ফার্মের বাদামি) দাম হালিতে ৫ টাকা বেড়ে ১শ ৬০ টাকায় ডজন বিক্রি হচ্ছে। এতদিন যা ৪০ টাকা ছিল। সেখান থেকে সম্প্রতি ১০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা এখন সর্বশেষ তা বিক্রি হচ্ছে ডজন প্রতি ১শ ৬০ টাকায়। মাঝারি ও সরু চালের দাম কেজিতে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগেও ২কেজির প্যাকেটজাত আটা ও ময়দার দাম ছিল ১শ থেকে ১শ ১০ টাকা, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ১শ ২০ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্য দুটির দাম বেড়েছে কমপক্ষে ১০ টাকা। কেজিতেও খোলা ও প্যাকেট ভেদে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি রয়েছে। খোলা সয়াবিনের দাম একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও ১৯৫ টাকা তো কোথাও ২০০ টাকা। বড় দানা মসুর ডাল আগে সর্বনিম্ন ৯০ টাকায় কেনা গেলেও এখন তা বেশির ভাগ দোকানে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। সবজির বাজারে বেগুন, শিম, করলার মতো কিছু পদের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। এ ছাড়া অন্য প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এদিকে সুগন্ধি চালের মধ্যে পোলাও চালের দাম বেড়ে এখন ২১০ টাকা হয়েছে। প্যাকেটের কেজি ২২০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তরল দুধের দাম গত মাসে ১০০ টাকা লিটার কেনা গেলেও এখন তা ১১০ টাকা হয়েছে। মাংসের যেসব দোকানে এতদিন গরুর মাংসের কেজি ৭৮০ টাকা বিক্রি হয়েছে, সেগুলোর কোথাও কোথাও এখন দাম বেড়ে ৮০০ টাকা হয়েছে। তবে মুরগি ও খাসির বাজার অপরিবর্তিত রয়েছে। যদিও বিক্রেতারা বলছেন, শুক্রবারের বাজারে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।

সুত্রাপুর এলাকার ক্ষুদ্র ফার্নিচার ব্যবসায়ী কাজী ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘বাজারে সব জিনিসপত্রের দাম কেবল বাড়ছেই। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন কঠিন হয়ে পড়ছে। ৫ সদস্যের পরিবারে ছেলে মেয়ের লেখাপড়া খরচ বাদে খাওয়া ও পোশাকের খরচ অর্ধেকে নেমে এসেছে, তাতে ও কুলিয়ে উঠতে পারছি না। আমার ছোট ব্যবসা বিক্রয় অর্ডার নেই বললে চলে,   এর মধ্যে বাজারে নতুন করে কিছু পণ্যের দাম বাড়ায় চাপ আরও বেড়েছে। নিত্যনতুন অজুহাতে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে সীমিত আয়ের টাকায় মাসের বাজার খরচ সামাল দেওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। হিসাব মেলাতে ধার-কর্জ করতে হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম যাতে সহনীয় ও যৌক্তিক পর্যায়ে থাকে, সেজন্য বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার’।

কমলাপুর এলাকার নাইনপাশ রিকশা চালক মো.জালাল উদ্দিন বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়লেই জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। দেখা যায় দাম যতটা বাড়ার কথা তার চেয়ে বেশি বাড়িয়ে দেওয়া দেয় ব্যবসায়ীরা। যাদের আয় বেশি তাদের চাপ কম, কিন্তু আমাদের মতো দৈনিক গড়ে ৮০০-১০০০ টাকা আয় করাই যাদের কষ্ট হইয়া যায়, তাদের কাছে জিনিসপত্রের দাম কেজিতে ৫ টাকা বাড়লেও অনেক চাপ বাইড়া যায়। বাজারের এই ব্যাঙ লাফানো দামের রীতি বন্ধ করা উচিত (কস্টক্লান্ত হাসি মুখে বলেন জালাল)। নইলে আমাদের চাইরটা খাইয়া পইড়া বাইচা থাকা মুশকিল হয়ে পড়ছে।’

এ বিষয়ে কথা হয়, ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের মাঝে যে কোনো অজুহাতে পণ্যের দাম বেশি বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ানোয় তারা আরও একটি অজুহাত পেয়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বেশকিছু পণ্যে পড়তে শুরু করেছে। এতে ভোক্তাদের ওপর খরচের চাপ আরও বাড়ছে, তাদের কষ্টও বাড়ছে।

হোসাইন আরও বলেন, জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় এতটা বাড়লে তার প্রভাব সবক্ষেত্রে পড়ে। কারণ এর সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার প্রায় সব বিষয়ই সরাসরি সম্পর্কিত। কিন্তু বাজারে ঢালাওভাবে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যৌক্তিকের চেয়ে বেশি বাড়ানো হয়। এই প্রবণতা ঠেকাতে বাজারে নজরদারি আরও বাড়াতে হবে।

কাপ্তানবাজার ডিমের পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিমের দাম যখন কিছুটা কমার দিকে গিয়েছিল, ঠিক তখন ফিডের দাম নতুন করে অত্যধিক বেড়ে গেছে। তার ওপর জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ভাড়াও বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে দাম কমার বদলে নতুন করে কিছুটা বাড়তি রয়েছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের এক পাইকারি চাল ব্যবসায়ী জানান, চালের দাম অনেকটা সময় ধরে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণ দেখিয়ে সরু ও মাঝারি চালের দাম বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১শ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। আর পোলাও চালের বাজারে চালের সংকট দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে মিলগুলো।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট এলাকার বাজারে তরল দুধের একটি ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী জানান, সংগ্রহ পর্যায়ে দুধের দাম, দুধ প্রস্তুতে ব্যয় ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় লিটারপ্রতি ১০ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে।

শ্যামবাজারের পাইকারি সবজি বিক্রেতারাও বলছেন, আগাম শীতের সবজি উঠার পর দাম কিছুটা কমে আসছিল। এমন সময় জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। এখন যে যেভাবে পারছে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে। এর প্রভাবে পাইকারিতে কাঁচা পণ্যের দামও বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই সব পণ্যের দাম বাড়বে, বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে কিলোমিটার প্রতি পরিবহন ভাড়া কত পয়সা হওয়া উচিত এবং বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কত পয়সা বাড়তে পারে, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের দ্রুত সে বিষয়ে বিশ্লেষণ দেওয়া উচিৎ। জ্বালানির দাম বেড়েছে কিলোমিটার প্রতি পয়সার হিসেবে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা কেজি প্রতি দাম বাড়িয়েছে কয়েকশ গুণ বেশি, যা টাকার হিসেবে!

জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে গ্রাম থেকে ঢাকায় সব্জি বা পণ্য আনতে কত পয়সা অতিরিক্ত খরচ হবে, তা আগে নির্ধারণ করা দরকার। এরপর কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে বাজার তদারকি করতে পারে। এ পদ্ধতি কার্যকর করলে ব্যবসায়ীদের ইচ্ছেমত মোনাফা লুটে দাম বাড়ানোর মানসিকতা কমে আসবে।

–টিভি টুডে

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে আরও ৫০৮ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে কী?

উচ্চমূল্যের বাজারে ফের নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ

আপডেট : ১২:৫২:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

উচ্চমূল্যের বাজারে ফের নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ

-শেখ নূর ইসলাম

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম বা উচ্চমূল্যের বাজারে নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ বর্তমান সময়ে এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর সমস্যা। আয়ের তুলনায় দৈনন্দিন জীবনে ভোগ্যপণ্যের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন নিম্ন আয়ের কর্মজীবী ও সাধারণ আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। ভোগ্যপণ্য বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা  অস্থিরতায় কোনভাবেই স্বস্তি পাচ্ছে না সাধারণ ক্রেতারা। মূল্যবৃদ্ধির চরম ভোগান্তির মধ্যে নতুন করে বাড়িয়েছে সয়াবিন তেল ও চিনির তীব্র সরবরাহ সংকট। সরকার নির্ধারিত সরবোচ্চ খুচরা মূল্যের তোয়াক্কা না করে বাজারে খোলা ও প্যাকেটজাত- উভয় পণ্যই বিক্রি হচ্ছে ব্যবসায়ীদের মর্জি-মাফিক বাড়তি দামে। সেই সঙ্গে বাড়তিমূল্যে আটকে আছে ডিম, সব্জি ও সাধারণ পণ্যের দাম। ফলে বাজারে এসে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের বাড়ছে হায় হুতাসের দীর্ঘশ্বাস।

পরিবহন খাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে থেকেই বেশি দামে নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে এমনিতেই চাপে আছে সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে নতুন করে বেড়েছে চাল, আটা, ময়দা, ডাল, ভোজ্য তেল, ডিম, দুধ ও বিভিন্ন সবজির দাম। এক মাসের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক বাজার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে সে চিত্র।

বিক্রেতারা এতদিন সরবরাহের সংকটের কথা বললেও ব্যবসায়ীরা এখন নতুন করে বাড়তি পরিবহন ভাড়ার দোহাই দিচ্ছেন। কিন্তু ভোক্তাদের অভিযোগ, পরিবহন ভাড়া বাড়লেও সেই অজুহাতে পণ্যের দাম অতিরিক্ত বাড়ানো হচ্ছে। তারা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে সব পণ্যের দাম বেশি হারে বাড়িয়ে দেওয়া এখন রীতিতে পরিণত হয়েছে। এ প্রবণতা বন্ধে বাজারে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

ভোগ্যপণ্য সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির বাজার চিত্র বলছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর তার প্রভাব বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। এতে বেশ কিছু পণ্যের দাম নতুন করে বেড়েছে। খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা তেমনটাই জানাচ্ছেন। টিসিবির এক মাসের পণ্যমূল্য বিশ্লেষণ বলছে, মাসের ব্যবধানে কেজিপ্রতি মাঝারি চালের দাম ২ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং সরু চালের দাম ১ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়েছে।

তবে বাজারে বেশি বেড়েছে আটা-ময়দার দাম। এ সময় প্যাকেট আটায় ৮ শতাংশ ও প্যাকেট ময়দার কেজিতে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ দাম বেড়েছে। অপরদিকে প্রতি কেজি খোলা আটায় ২ শতাংশ ও ময়দায় ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়েছে। মাসের ব্যবধানে এক লিটারের বোতলে ২ দশমিক ৫১ শতাংশ, দুই লিটারের বোতলে ৩ শতাংশ, পাঁচ লিটারের বোতলে ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ দাম বেড়েছে। খোলা সয়াবিনের লিটারেও ভোক্তার ১ শতাংশ ও পাম তেলে ২ শতাংশ খরচ বেড়েছে।

বাজারে ডালের মধ্যে বড় দানার মশুর ডালের দাম চলতি মাসে কেজিপ্রতি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ দাম বেড়েছে। বেড়েছে ছোলার দামও; ১০ দশমিক ৫২ শতাংশ। ডিমের দাম হালিতে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ দাম বেড়েছে। এ ছাড়া কাঁচাবাজারে বেগুন, শসা ও কাঁচামরিচের দামও ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

শুক্রবার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ডিমের (ফার্মের বাদামি) দাম হালিতে ৫ টাকা বেড়ে ১শ ৬০ টাকায় ডজন বিক্রি হচ্ছে। এতদিন যা ৪০ টাকা ছিল। সেখান থেকে সম্প্রতি ১০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা এখন সর্বশেষ তা বিক্রি হচ্ছে ডজন প্রতি ১শ ৬০ টাকায়। মাঝারি ও সরু চালের দাম কেজিতে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগেও ২কেজির প্যাকেটজাত আটা ও ময়দার দাম ছিল ১শ থেকে ১শ ১০ টাকা, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ১শ ২০ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্য দুটির দাম বেড়েছে কমপক্ষে ১০ টাকা। কেজিতেও খোলা ও প্যাকেট ভেদে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি রয়েছে। খোলা সয়াবিনের দাম একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও ১৯৫ টাকা তো কোথাও ২০০ টাকা। বড় দানা মসুর ডাল আগে সর্বনিম্ন ৯০ টাকায় কেনা গেলেও এখন তা বেশির ভাগ দোকানে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। সবজির বাজারে বেগুন, শিম, করলার মতো কিছু পদের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। এ ছাড়া অন্য প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এদিকে সুগন্ধি চালের মধ্যে পোলাও চালের দাম বেড়ে এখন ২১০ টাকা হয়েছে। প্যাকেটের কেজি ২২০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তরল দুধের দাম গত মাসে ১০০ টাকা লিটার কেনা গেলেও এখন তা ১১০ টাকা হয়েছে। মাংসের যেসব দোকানে এতদিন গরুর মাংসের কেজি ৭৮০ টাকা বিক্রি হয়েছে, সেগুলোর কোথাও কোথাও এখন দাম বেড়ে ৮০০ টাকা হয়েছে। তবে মুরগি ও খাসির বাজার অপরিবর্তিত রয়েছে। যদিও বিক্রেতারা বলছেন, শুক্রবারের বাজারে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।

সুত্রাপুর এলাকার ক্ষুদ্র ফার্নিচার ব্যবসায়ী কাজী ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘বাজারে সব জিনিসপত্রের দাম কেবল বাড়ছেই। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন কঠিন হয়ে পড়ছে। ৫ সদস্যের পরিবারে ছেলে মেয়ের লেখাপড়া খরচ বাদে খাওয়া ও পোশাকের খরচ অর্ধেকে নেমে এসেছে, তাতে ও কুলিয়ে উঠতে পারছি না। আমার ছোট ব্যবসা বিক্রয় অর্ডার নেই বললে চলে,   এর মধ্যে বাজারে নতুন করে কিছু পণ্যের দাম বাড়ায় চাপ আরও বেড়েছে। নিত্যনতুন অজুহাতে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে সীমিত আয়ের টাকায় মাসের বাজার খরচ সামাল দেওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। হিসাব মেলাতে ধার-কর্জ করতে হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম যাতে সহনীয় ও যৌক্তিক পর্যায়ে থাকে, সেজন্য বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার’।

কমলাপুর এলাকার নাইনপাশ রিকশা চালক মো.জালাল উদ্দিন বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়লেই জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। দেখা যায় দাম যতটা বাড়ার কথা তার চেয়ে বেশি বাড়িয়ে দেওয়া দেয় ব্যবসায়ীরা। যাদের আয় বেশি তাদের চাপ কম, কিন্তু আমাদের মতো দৈনিক গড়ে ৮০০-১০০০ টাকা আয় করাই যাদের কষ্ট হইয়া যায়, তাদের কাছে জিনিসপত্রের দাম কেজিতে ৫ টাকা বাড়লেও অনেক চাপ বাইড়া যায়। বাজারের এই ব্যাঙ লাফানো দামের রীতি বন্ধ করা উচিত (কস্টক্লান্ত হাসি মুখে বলেন জালাল)। নইলে আমাদের চাইরটা খাইয়া পইড়া বাইচা থাকা মুশকিল হয়ে পড়ছে।’

এ বিষয়ে কথা হয়, ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের মাঝে যে কোনো অজুহাতে পণ্যের দাম বেশি বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ানোয় তারা আরও একটি অজুহাত পেয়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বেশকিছু পণ্যে পড়তে শুরু করেছে। এতে ভোক্তাদের ওপর খরচের চাপ আরও বাড়ছে, তাদের কষ্টও বাড়ছে।

হোসাইন আরও বলেন, জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় এতটা বাড়লে তার প্রভাব সবক্ষেত্রে পড়ে। কারণ এর সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার প্রায় সব বিষয়ই সরাসরি সম্পর্কিত। কিন্তু বাজারে ঢালাওভাবে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যৌক্তিকের চেয়ে বেশি বাড়ানো হয়। এই প্রবণতা ঠেকাতে বাজারে নজরদারি আরও বাড়াতে হবে।

কাপ্তানবাজার ডিমের পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিমের দাম যখন কিছুটা কমার দিকে গিয়েছিল, ঠিক তখন ফিডের দাম নতুন করে অত্যধিক বেড়ে গেছে। তার ওপর জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ভাড়াও বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে দাম কমার বদলে নতুন করে কিছুটা বাড়তি রয়েছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের এক পাইকারি চাল ব্যবসায়ী জানান, চালের দাম অনেকটা সময় ধরে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণ দেখিয়ে সরু ও মাঝারি চালের দাম বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১শ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। আর পোলাও চালের বাজারে চালের সংকট দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে মিলগুলো।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট এলাকার বাজারে তরল দুধের একটি ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী জানান, সংগ্রহ পর্যায়ে দুধের দাম, দুধ প্রস্তুতে ব্যয় ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় লিটারপ্রতি ১০ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে।

শ্যামবাজারের পাইকারি সবজি বিক্রেতারাও বলছেন, আগাম শীতের সবজি উঠার পর দাম কিছুটা কমে আসছিল। এমন সময় জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। এখন যে যেভাবে পারছে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে। এর প্রভাবে পাইকারিতে কাঁচা পণ্যের দামও বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই সব পণ্যের দাম বাড়বে, বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে কিলোমিটার প্রতি পরিবহন ভাড়া কত পয়সা হওয়া উচিত এবং বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কত পয়সা বাড়তে পারে, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের দ্রুত সে বিষয়ে বিশ্লেষণ দেওয়া উচিৎ। জ্বালানির দাম বেড়েছে কিলোমিটার প্রতি পয়সার হিসেবে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা কেজি প্রতি দাম বাড়িয়েছে কয়েকশ গুণ বেশি, যা টাকার হিসেবে!

জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে গ্রাম থেকে ঢাকায় সব্জি বা পণ্য আনতে কত পয়সা অতিরিক্ত খরচ হবে, তা আগে নির্ধারণ করা দরকার। এরপর কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে বাজার তদারকি করতে পারে। এ পদ্ধতি কার্যকর করলে ব্যবসায়ীদের ইচ্ছেমত মোনাফা লুটে দাম বাড়ানোর মানসিকতা কমে আসবে।

–টিভি টুডে