
শেখ হাসিনা-রেহানাসহ ৩জনের বিরুদ্ধে মামলা
বঙ্গবন্ধু ট্রাস্টের নামে ২৭৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
শেখ নূর ইসলাম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে ৪১টি বেসরকারি ব্যাংকের সিএসআর (সামাজিক দায়বদ্ধতা) তহবিল থেকে অবৈধভাবে ২৭৬ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহের পর তা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি মানলা দায়ের করেছে। ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস –এর (বিএবি) সাবেক সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে এই মামলাটি রুজু করা হয়।
দেশের ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ ও আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের সহকারী পরিচালক মো ইসমাইল হোসেন বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সংস্থার সমন্বিত জেলা কার্যালয় ধাকা-১ এ মামলা করেন।
তদন্তের অংশ হিসেবে ৪১ ব্যাংকের কাছে অর্থ ছাড়, বোর্ডের অনুমোদন, লেনদেন ও ব্যয়ের নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। অর্থ ছাড়ের অনুমোদন থেকে শুরু করে টাকা কোথায়, কীভাবে ব্যয় হয়েছে-পুরো প্রক্রিয়াই খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে চিঠি পাঠান। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ট্রাস্টের নামে এসব অর্থ ছাড় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থ কী প্রক্রিয়ায় অনুমোদন ও ছাড় করা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা যাচাই করা হচ্ছে।
ব্যাংকগুলোর কাছে চাওয়া নথির মধ্যে রয়েছে বোর্ড সভার কার্যবিবরণী, অনুমোদনসংক্রান্ত কাগজপত্র, চেক, পে-অর্ডার, ভাউচার, হিসাব বিবরণী এবং ট্রাস্টের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের তথ্য।
বছরভিত্তিক ও খাতওয়ারি সিএসআর ব্যয়ের বিবরণীও চেয়েছে দুদক। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের কাছে ট্রাস্টের নামে অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভার কার্যবিবরণী ও উপস্থিতি তালিকার মূল কপি চাওয়া হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সিএসআর তহবিলের হিসাব বিবরণী এবং ওই সময়ের আগে বা পরে ট্রাস্টের নামে অর্থ দেওয়া হলে তার হিসাবও দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও বিএবির সাবেক সভাপতি এবং এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ট্রাস্টের অনুকূলে ওই অর্থ সংগ্রহ করেন।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, বিএবির তৎকালীন সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার নির্বাহী কমিটির সভায় নির্ধারিত আলোচ্যসূচির বাইরে ‘বিবিধ’ আলোচনায় ট্রাস্টকে সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব তোলেন। পরে নির্বাহী কমিটির সভায় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কোন ব্যাংক কত টাকা দেবে, তা উল্লেখ করে ব্যাংকগুলোকে অর্থ দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হয়।
পর্যায়ক্রমে ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে থেকে মোট ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয় বলে দুদকের অভিমত। মামলায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআরবিষয়ক নীতিমালায় এ ধরনের ট্রাস্টকে অনুদান দেওয়ার কোনো বিধান নেই।
দুদক আরও বলছে, সরেজমিন পরিদর্শনে ট্রাস্টের ঠিকানায় দাপ্তরিক কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২২-২৩ করবর্ষের আয়কর রিটার্নে ট্রাস্টের ৬৭ কোটি ৫৩ লাখ ৬২ হাজার ৪৪৯ টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেলেও ওই ব্যয়ের পক্ষে প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র ও ভাউচার পাওয়া যায়নি।
ট্রাস্টটি সমাজসেবা অধিদপ্তর ও এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান নয় বলেও এজাহারে দাবি করেছে দুদক।
দুদকের ভাষ্য, ট্রাস্টের প্রতিশ্রুত কার্যক্রম বাস্তবায়নের পপ্রমাণ ও অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ‘ব্যক্তিগত লাভের অসৎ উদ্দেশ্যে’ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলে বিএবির মাধ্যমে ‘প্রভাব বিস্তার করে’ ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে দুদকের অভিযোগ, বিএবির সভাপতি থাকার সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রভাব ব্যবহার করে ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ট্রাস্টে অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখেন।
এভাবে সিএসআর তহবিল থেকে ট্রাস্টে অনুদান দেওয়ার বিধান না থাকার পরও ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করে’ ব্যাংগুলোকে অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
সর্বশেষ এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ –এর ৫ (২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
কী হতে পারে এ মামলায়!
এ মামলায় আবেদনকারি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা দণ্ডবিধির ৪০৯, ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ –এর ৫(২) ধারার অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হলে আসামিরা সরবোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বড় অঙ্কের অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
বাংলাদেশে দুর্নীতি এবং সরকারি তহবিলের অর্থ বা সম্পদ আত্মসাতের মামলাগুলোতে সাধারণত নিম্নে বর্ণিত ধারাগুলো একত্রে প্রয়োগ করা হয়:
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ –এর ৪০৯ ধারা (সরকারি কর্মচারী বা ব্যাংকার কর্তৃক অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ)
সরকারি কর্মচারী, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী বা এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কোনো ব্যক্তি যদি তার কাছে গচ্ছিত কোনো সম্পত্তি বা অর্থ অসৎ উদ্দশ্যে আত্মসাৎ করেন, তবে তা অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ (Criminal Breach of Trust) হিসেবে গণ্য হয়। এ জন্য-
সম্ভাব্য শাস্তি: সরবোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং সেই সাথে বাধ্যতামূলক অর্থদণ্ড।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ –এর ১০৯ ধারা (অপরাধে সহায়তা বা প্ররোচনা)
এই ধারাটি মূল অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও যারা অপরাধ সংগঠনে সাহায্য, উসকানি বা ষড়যন্ত্র করেছেন (Abettor) তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।
সম্ভাব্য শাস্তি: আইনি বিধান অনুযায়ী, অপরাধে প্ররোচনা দেওয়ার জন্য যদি আলাদা কোনো শাস্তির উল্লেখ না থেকে, তবে সহায়তাকারীকে মূল অপরাধীর সমান শাস্তি দেওয়া হয়। অর্থাৎ, মূল অপরাধী ৪০৯ বা ৫(২) ধারায় যে শাস্তির যোগ্য হবেন, সহায়তাকারী ও ঠিক একই দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন,১৯৪৭ –এর ৫(২) ধারা (অপরাধমূলক অসদাচরণ)
কোনো সরকারি কর্মচারী যদি নিজের বা অন্য কারো জন্য অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে বা দুর্নীতির মাধ্যমে কোনো আর্থিক সুবিধা অর্জন করেন বা সরকারি সম্পত্তি অপব্যবহার করেন, তবে তা অপরাধমূলক অসদাচরণ (Criminal Misconduct) হিসেবে গণ্য হয়।
সম্ভাব্য শাস্তি: সরবোচ্চ ৭বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। অতিরিক্ত শাস্তি হিসেবে এই অপরাধমূলক অসদাচরণের মাধ্যমে অর্জিত বা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আর্থিক সম্পদ বা সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত (Confiscated to the State) করা হয়।
–টিভি টুডে
TV Today HD Desk: 




















