
১৯ টি সংগঠনের সমন্বয়ে বৈঠক
দয়া করে হাতটা বাঁধবেন না, আবার আমাদের কাছে আসতে হবে: মতিউর
সাংবাদিক বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতায়নে উদ্বেগ
নিজস্ব প্রতিনিধি:
গোলটেবিল বৈঠকে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ সাংবাদিকদের বিচারের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ক্ষমতা দেওয়ার বিধান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আইনের অস্পষ্ট সংজ্ঞা ও ব্যাপক ক্ষমতা প্রয়োগের বিধান গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করতে পারে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে হয়রানি করা হতে পারে। একজন ব্যক্তির অপরাধের দায়ে পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
প্রস্তাবিত আইনটি নিয়ে গতকাল (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এসব বক্তব্য উঠে আসে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান –এর সঞ্চালনায় টিআইবি, ব্র্যাক, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ ১৯টি সংগঠন এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা এ আলোচনায় অংশ নেন।
‘দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।’ …গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা হবেই। কোনটি অপরাধ আর কোনটি সমালোচনা, সেই পার্থক্য স্পষ্ট না থাকলে আইনটি অপপ্রয়োগের ঝুঁকি তৈরি করবে।’
আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সরকার সমালোচনার বিরুদ্ধে আইন করতে চাইলেও ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই আইনই তাদের জন্য বিপদ হয়ে উঠতে পারে। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।’
মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক বলেন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইনের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সরকারের সমালোচনা ও সাইবার অপরাধকে এক করে দেখা যাবে না। গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা হবেই। কোনটি অপরাধ আর কোনটি সমালোচনা, সেই পার্থক্য স্পষ্ট না থাকলে আইনটি অপপ্রয়োগের ঝুঁকি তৈরি করবে। আইনপ্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা তুলে ধরে তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতার ফোনেও কাউকে গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আইন প্রণয়ন করা জরুরি। পৃথিবীতে কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। তাই ভবিষ্যতের কথাও মাথায় রেখে আইন করতে হবে।
‘ভেজাল ওষুধ যারা তৈরি করেন, তাদের ধরার জন্য যে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ব্যবহার করা হয়, সেই আদালতের কাছে আপনি সাংবাদিকের বিচারের ক্ষমতা দিচ্ছেন। এটা কী করে একটা গণতান্ত্রিক সমাজে চিন্তা করা যেতে পারে।… ‘কোনো ব্যক্তির অপরাধের জন্য সংবাদপত্র বা অনলাইন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়’।
সাংবাদিকদের বিচারের ক্ষমতা ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাতে দেওয়ার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ভেজাল ওষুধ যারা তৈরি করেন, তাদের ধরার জন্য যে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ব্যবহার করা হয়, সেই আদালতের কাছে আপনি সাংবাদিকের বিচারের ক্ষমতা দিচ্ছেন। এটা কী করে একটা গণতান্ত্রিক সমাজে চিন্তা করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির অপরাধের জন্য সংবাদপত্র বা অনলাইন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। আমার অপরাধের জন্য মানবজমিন বন্ধ করে দেওয়া যায় না। এ ধরনের বিধান গণমাধ্যমের অস্তিত্বের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’
‘প্রস্তাবিত আইনে বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চেয়ে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা প্রাধান্য পেয়েছে। অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে এ কাঠামোয় আইন পাস করা হলে তা শুধু নাগরিক অধিকার ক্ষূণ্ণ করবে না, সরকারের জন্যও আত্মঘাতী হতে পারে। …প্রস্তাবিত আইনটি সরকারের জন্য বুমেরাং হবে। আত্মঘাতী হবে। সরকারের উচিত এই অবস্থান থেকে সরে আসা। ডিজিটাল অধিকার, গণমাধ্যমের কার্যক্রম এবং অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো একই আইনের আওতায় আনলে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হয়’।
এ সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবিত আইনে বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চেয়ে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা প্রাধান্য পেয়েছে। অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে এ কাঠামোয় আইন পাস করা হলে তা শুধু নাগরিক অধিকার ক্ষূণ্ণ করবে না, সরকারের জন্যও আত্মঘাতী হতে পারে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি সরকারের জন্য বুমেরাং হবে। আত্মঘাতী হবে। সরকারের উচিত এই অবস্থান থেকে সরে আসা। ডিজিটাল অধিকার, গণমাধ্যমের কার্যক্রম এবং অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো একই আইনের আওতায় আনলে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অপতথ্য মোকাবিলার নামে মানুষের অধিকারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যৌক্তিক নয়। আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় সাংবাদিক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে যুক্ত করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষার প্রশ্নে নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য জরুরি।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ও ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে মানহানির অভিযোগ মোকাবিলায় সাইবার আইনের পরিবর্তে প্রচলিত মানহানি আইন কার্যকর করা উচিত। সাইবার আইনের আওতায় এসব অপরাধের বিচার হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি প্রস্তাবিত আইনের ২৬(ক) ধারা বাদ দেওয়া, ২৫ ধারায় মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা, ৮(৩) ধারার অপব্যবহার রোধ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা বাতিলের বিষয়ে বৃহত্তর ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবারদের মাধ্যমে চরিত্রহনন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থাও প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি ও মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত আইন দেখে মনে হচ্ছে, এটি ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এতে গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে একজন ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের কারণে পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার মতো বিধান রয়েছে। এ ছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তা শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের ডেটা সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি জব্দ করার ক্ষমতা পেতে পারেন। এতে একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। মানহানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকার বিষয়টিও উদ্বেগজনক।
বৈঠকে রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক ও প্রকাশক শরীফুজ্জামান পিন্টু বলেন, সাইবার অপরাধ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার নামে মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা হলে তা নতুন সংকট তৈরি করবে।
গোলটেবিল আলোচনায় টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ প্রধান ফৌজিয়া আফরোজসহ অন্য প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
–টিভি টুডে
TV Today HD Desk: 





















