ঢাকা ০৮:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ইরানে আরও ৫০৮ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে কী? Logo বাংলাদেশ-জাপান ৬ চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি Logo যুক্তরাষ্ট্রকে শিক্ষা দিতে যুদ্ধের মূল্য চুকানোর হুঁশিয়ারি ইরানের Logo আইসিসিবিতে শুরু হলো পাঁচ দিনব্যাপী দেশীয় ফার্নিচার মেলা Logo অনিশ্চয়তায় সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম তৈরি, অর্থাভাবে ধুঁকছে গবেষণাকেন্দ্র Logo চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিক পাচার Logo জাপানের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে পোস্টে যা বললেন Logo সমুদ্রবন্দর ও শিল্প পার্ক নির্মাণে পিপিপি মডেল চায় সোজিৎজ ও এনার্জিপ্যাক Logo বিশ্ব জ্বালানির রূপান্তর পারমাণবিক শক্তিকে ছাড়াল বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ Logo পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৬.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান

বড় সংকটের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব অর্থনীতি, সতর্ক করল আইএমএফ

  • TV Today HD Desk:
  • আপডেট : ১০:০১:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
  • ২২ Time View

বড় সংকটের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব অর্থনীতি, সতর্ক করল আইএমএফ

টিভি টুডে ডেস্ক:

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করেছে যে বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে তার সহনশীলতা বা টিকে থাকার ক্ষমতার শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে এবং বড় ধরনের সংকটের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় এই সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়।

ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান (মধ্যপ্রাচ্যের) সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, জরুরি তেলের মজুত কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় নতুন অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

আইএমএফের সতর্কবার্তা, গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে আশঙ্কার তুলনায় কম পড়লেও পরিস্থিতি এখনও ঝুঁকিমুক্ত নয়। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে তেল সরবরাহ এবং কৌশলগত জ্বালানির মজুত বাজারে ছাড়ার ফলে তেলের দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু জরুরি মজুত কমে আসায় এবং অনেক দেশের সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ায় ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম আবার বেড়ে গেলে ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হতে পারে।

মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এ সপ্তাহে ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নীতিগত সংকট মোকাবিলার সুরক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন না করা হলে বিশ্ব অর্থনীতি শিগগিরই সহনশীলতার সীমা পরীক্ষা করতে পারে।”

এতে আরও বলা হয়, জ্বালানির মজুত কমে আসছে। নতুন কোনও ভূরাজনৈতিক ধাক্কা এলে তা দ্রুত জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

জরুরি তেলের মজুত কমছে
চলতি বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বাজারে জরুরি মজুত থেকে ইতিহাসের বৃহত্তম পরিমাণ তেল ছাড়ার ঘোষণা দেয়। গত মাসে জ্বালানিমন্ত্রীদের বৈঠকের পর এ সরবরাহ আরও দ্রুত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।

তবে জরুরি মজুতের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা তুলে ধরছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছান। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার ডিজেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জ্বালানির খুচরা মূল্য কমানোর উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এর ফলে দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।

আইএমএফের আশঙ্কা, তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে পরিবহন, উৎপাদন ও ভোগব্যয়ের ওপর চাপ বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়াল আইএমএফ
ঝুঁকির কথা বললেও চলতি বছরের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। গত জুলাইয়ের পূর্বাভাসে এই হার ছিল ৩ শতাংশ।

২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চলতি বছর ২ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও বাড়িয়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ করা হয়েছে; আগে যা ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও চলতি বছরের জন্য বাড়িয়েছে আইএমএফ। দেশটির প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা জুলাইয়ের পূর্বাভাসের চেয়ে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।

তবে ২০২৭ সালে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আগে এ হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ ধরা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম বেশি থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বাড়ার কারণে ভোগ ও বিনিয়োগ কমে যাওয়াকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা
জ্বালানির দাম উঁচু পর্যায়ে থাকায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আগের ধারণার তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে থাকতে পারে। গত জুলাইয়ের পূর্বাভাসেও একই হার ধরা হয়েছিল। ২০২৭ সালে মূল্যস্ফীতি কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগে এ হার ৪ শতাংশ অনুমান করা হয়েছিল।

ব্যাংককে প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে আইএমএফের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সিলভানা তেনরেইরো বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন পর্যন্ত ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে, কিন্তু সেই সক্ষমতা তার সীমার কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের শুধু সংকট মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থনৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাও বিশ্বজুড়ে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় সরকারগুলোকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নিতে আর দেরি করা উচিত নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও এআই বাজারে ধসের ঝুঁকি
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া কিংবা আরও তীব্র হয়ে ওঠার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আইএমএফ। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। জ্বালানি অবকাঠামোয় নতুন হামলা, সাইবার আক্রমণ কিংবা চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাও সংকটের প্রভাব বাড়াতে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনার কথা ট্রাম্প বলে আসছেন। অন্যদিকে, সংঘাতের অবসানে কোনও শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে- এমন স্পষ্ট লক্ষণও নেই।

আইএমএফ আরও সতর্ক করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকেন্দ্রিক বিনিয়োগের উত্থান ঘিরে আর্থিক বাজারে ধস নামার ঝুঁকিও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।

এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বাড়লেই অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

আইএমএফের মতে, বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই নতুন সংকট মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের নমনীয়তা, সতর্কতা এবং আগাম প্রস্তুতি এখন আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে আরও ৫০৮ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে কী?

বড় সংকটের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব অর্থনীতি, সতর্ক করল আইএমএফ

আপডেট : ১০:০১:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বড় সংকটের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব অর্থনীতি, সতর্ক করল আইএমএফ

টিভি টুডে ডেস্ক:

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করেছে যে বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে তার সহনশীলতা বা টিকে থাকার ক্ষমতার শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে এবং বড় ধরনের সংকটের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় এই সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়।

ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান (মধ্যপ্রাচ্যের) সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, জরুরি তেলের মজুত কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় নতুন অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

আইএমএফের সতর্কবার্তা, গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে আশঙ্কার তুলনায় কম পড়লেও পরিস্থিতি এখনও ঝুঁকিমুক্ত নয়। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে তেল সরবরাহ এবং কৌশলগত জ্বালানির মজুত বাজারে ছাড়ার ফলে তেলের দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু জরুরি মজুত কমে আসায় এবং অনেক দেশের সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ায় ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম আবার বেড়ে গেলে ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হতে পারে।

মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এ সপ্তাহে ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নীতিগত সংকট মোকাবিলার সুরক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন না করা হলে বিশ্ব অর্থনীতি শিগগিরই সহনশীলতার সীমা পরীক্ষা করতে পারে।”

এতে আরও বলা হয়, জ্বালানির মজুত কমে আসছে। নতুন কোনও ভূরাজনৈতিক ধাক্কা এলে তা দ্রুত জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

জরুরি তেলের মজুত কমছে
চলতি বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বাজারে জরুরি মজুত থেকে ইতিহাসের বৃহত্তম পরিমাণ তেল ছাড়ার ঘোষণা দেয়। গত মাসে জ্বালানিমন্ত্রীদের বৈঠকের পর এ সরবরাহ আরও দ্রুত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।

তবে জরুরি মজুতের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা তুলে ধরছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছান। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার ডিজেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জ্বালানির খুচরা মূল্য কমানোর উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এর ফলে দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।

আইএমএফের আশঙ্কা, তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে পরিবহন, উৎপাদন ও ভোগব্যয়ের ওপর চাপ বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়াল আইএমএফ
ঝুঁকির কথা বললেও চলতি বছরের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। গত জুলাইয়ের পূর্বাভাসে এই হার ছিল ৩ শতাংশ।

২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চলতি বছর ২ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও বাড়িয়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ করা হয়েছে; আগে যা ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও চলতি বছরের জন্য বাড়িয়েছে আইএমএফ। দেশটির প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা জুলাইয়ের পূর্বাভাসের চেয়ে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।

তবে ২০২৭ সালে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আগে এ হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ ধরা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম বেশি থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বাড়ার কারণে ভোগ ও বিনিয়োগ কমে যাওয়াকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা
জ্বালানির দাম উঁচু পর্যায়ে থাকায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আগের ধারণার তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে থাকতে পারে। গত জুলাইয়ের পূর্বাভাসেও একই হার ধরা হয়েছিল। ২০২৭ সালে মূল্যস্ফীতি কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগে এ হার ৪ শতাংশ অনুমান করা হয়েছিল।

ব্যাংককে প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে আইএমএফের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সিলভানা তেনরেইরো বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন পর্যন্ত ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে, কিন্তু সেই সক্ষমতা তার সীমার কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের শুধু সংকট মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থনৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাও বিশ্বজুড়ে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় সরকারগুলোকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নিতে আর দেরি করা উচিত নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও এআই বাজারে ধসের ঝুঁকি
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া কিংবা আরও তীব্র হয়ে ওঠার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আইএমএফ। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। জ্বালানি অবকাঠামোয় নতুন হামলা, সাইবার আক্রমণ কিংবা চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাও সংকটের প্রভাব বাড়াতে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনার কথা ট্রাম্প বলে আসছেন। অন্যদিকে, সংঘাতের অবসানে কোনও শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে- এমন স্পষ্ট লক্ষণও নেই।

আইএমএফ আরও সতর্ক করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকেন্দ্রিক বিনিয়োগের উত্থান ঘিরে আর্থিক বাজারে ধস নামার ঝুঁকিও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।

এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বাড়লেই অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

আইএমএফের মতে, বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই নতুন সংকট মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের নমনীয়তা, সতর্কতা এবং আগাম প্রস্তুতি এখন আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান