
ধর্ষণের অভিযোগে যুক্তরাজ্যে গ্রেফতার হয়েছিলেন পাকিস্তানের সাবেক মন্ত্রী
ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে ১৯৯০ –এর দশকে অসহায় একাধিক কিশোরীকে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন এবং শিশু পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে পাকিস্তানের সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীকে গ্রেফতার করেছিল ব্রিটিশ পুলিশ। গ্রেফতার হওয়া প্রভাবশালী ওই রাজনীতিকের নাম রুখসার আহমেদ (৬২)।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যে তাকে ধর্ষণ এবং পরিচর্যা কেন্দ্রের (কেয়ার হোম) শিশুদের পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে জামিনে রয়েছেন। তবে গত সপ্তাহেই পাঁচ বছর পর আবারও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দল ‘পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ’ (পিএমএল-এন) থেকে পাকিস্তানের আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর আইনসভার সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন ৬২ বছর বয়সী রুখসার আহমেদ।
দ্য গার্ডিয়ান সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে ম্যানচেস্টারের একটি পুলিশ স্টেশনে জামিনের শর্ত অনুযায়ী হাজির হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু অসুস্থতার কথা বলে বিমানে ভ্রমণ করতে পারবেন না- এই কারণ দেখিয়ে তিনি হাজির হননি।
অন্যদিকে, একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায়, তিনি উত্তর পাকিস্তানের মিরপুর এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) থেকে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন রুখসার আহমেদ। তিনি ২০০৬ সাল থেকে ২০২১ সালে নির্বাচনে পরাজিত হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন সরকারে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশ (জিএমপি) তার জামিনের শর্ত হিসেবে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চেয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে একজন বিচারক সেই কঠোর শর্ত অনুমোদন করেননি।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ম্যানচেস্টার বিমানবন্দরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগগুলো ম্যানচেস্টারের রাশলম এলাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যেখানে তিনি দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন।
রুখসার আহমেদের ফেসবুকে ১৭ হাজারের বেশি অনুসারী রয়েছে। চলতি বছরের মে মাসেও রাশলমে বন্ধুদের সঙ্গে তার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তার ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, তিনি নিয়মিতই ম্যানচেস্টরে যাতায়াত করতেন। ম্যানচেস্টারের বিখ্যাত ‘কারি মাইল’-এর কাছে অবস্থিত ‘গুজ্জর প্যালেস’ নামে একটি রেস্তোরাঁর মালিকও তিনি। তার এক বন্ধু জানান, পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকার কারণে তাকে দেখতে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসতেন।
তদন্তকারীরা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে অন্তত দুই নারীর অভিযোগের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তারা শিশু থাকাকালে রুখসার আহমেদ তাদের ধর্ষণ এবং পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময়ই তদন্তকারীরা প্রথম জানতে পারেন যে রুখসার আহমেদ পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় একজন ব্যক্তি।
চলমান তদন্তটি ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে বিভিন্ন কেয়ার হোমে থাকা শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। সে সময় রুখসার আহমেদের বয়স ছিল বিশের শেষ দিকে।
আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে তাকে আবারও পুলিশি জামিনের শর্ত অনুযায়ী হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি হাজির না হলে গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশ তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে পারে অথবা তাকে যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে আনতে প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। এতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে পিএমএল-এনের এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, তিনি প্রায় দুই দশক ধরে রুখসার আহমেদকে চেনেন। তবে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের এসব অভিযোগ সম্পর্কে আগে কিছুই জানতেন না।
তিনি বলেন, “শুধু শুনেছিলাম যে ১৯৯০-এর দশকে তিনি ম্যানচেস্টারের কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তা ব্যক্তিগতভাবে জানতাম না।”
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলেও রুখসার আহমেদ কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার যুক্তরাজ্যের বহুল আলোচিত রচডেল ‘গ্রুমিং গ্যাং’-এর অন্যতম দণ্ডপ্রাপ্ত সদস্য শাবির আহমেদকে দেশে ফেরত নেওয়ার ব্রিটিশ সরকারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।
৭৩ বছর বয়সী শাবির আহমেদ শিশু ধর্ষণের ৩০টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২২ বছরের কারাদণ্ড পান। এর মধ্যে ১৪ বছর কারাভোগের পর গত জুলাইয়ে তিনি মুক্তি পান।
রুখসার আহমেদের ঘনিষ্ঠজনেরা তাকে ম্যানচেস্টারের পাকিস্তানি কমিউনিটির অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের একজন বলেন, তিনি ছিলেন “মানুষের নেতা” এবং “সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের একজন”।
স্টকপোর্ট রোড এলাকার অনেক বাসিন্দাও তার প্রশংসা করেছেন। একজন স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, “তিনি নীতিবান মানুষ এবং অসহায়দের সাহায্য করেন।”
বিশেষ করে আজাদ কাশ্মীর অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তিনি যখনই ম্যানচেস্টরে আসতেন, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তবে দ্য গার্ডিয়ান সম্প্রতি ‘গুজ্জর প্যালেস’ রেস্তোরাঁটি পরিদর্শন করে সেটিকে পরিত্যক্ত ও বন্ধ অবস্থায় দেখতে পায়। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, অন্তত ২০০৯ সাল থেকেই রেস্তোরাঁটি বন্ধ রয়েছে। কোম্পানির নথি অনুযায়ী, রেস্তোরাঁটির মালিক প্রতিষ্ঠানটির একমাত্র পরিচালক রুখসার আহমেদ। তবে সময়মতো আর্থিক হিসাব জমা না দেওয়ায় চলতি বছরের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল।
–সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
TV Today HD Desk: 






















