
মমতার বিদায় নিজ দল থেকেই, তৃণমূল কংগ্রেস নতুন চেয়ারম্যান অরূপ রায়
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নাটকীয় ও অভাবনীয় ঘটনার কালের সাক্ষী হল রাজ্যবাসী। ১৯৯৮ সালে নিজের হাতে গড়া দল ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ (টিএমসি) থেকে বিদায় নিতে হল সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ক্ষমতার পালাবদলের পর এক সময় যা কল্পনায়ও ভাবা কঠিন ছিল, শেষ পর্যন্ত সেটাই বাস্তবে দেখা গেল। দেখতে পেল কলকাতার মানুষ, দেখতে পেল গোটা ভারতবর্ষ। যে দলটি প্রায় তিন দশক আগে গড়ে তুলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সয়ং, সেই দলের শীর্ষ পদ থেকেই সরিয়ে দেওয়া হল তাকে। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়।
সোমবার (২২ জুন) কলকাতার নিউটাউনের একটি পাঁচতারকা হোটেলে আয়োজিত বিশেষ বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রায় ৬০ জন বিধায়ক এবং কলকাতা পুরসভার অন্তত ৭০ জন কাউন্সিলর। বৈঠকের নেতৃত্বে ছিলেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংকট চরমে পৌছায়। তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে এত বড় পরিবর্তন ঘটল। দীর্ঘদিন ধরে দলের মুখ এবং প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে পরিচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবর্তে অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
একেবারে গোড়াতেই বৈঠকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সাংগঠনিক সংকটের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি জানান, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর সর্বভারতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক। সর্বশেষ ২০২২ সালে সেই কমিটি গঠিত হয়েছিল। এরপর নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিটি তৈরি হয়নি। সেই কারণেই জরুরি ভিত্তিতে এই বৈঠক ডাকা হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন। এরপর দ্রুত গতিতে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমে কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়। পরে ধ্বনি ভোটে অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, বরং তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে ওঠারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর দলের অভ্যন্তরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, এই বৈঠককে তারই প্রকাশ্য রূপ বলে মনে করা হচ্ছে। অরূপ রায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন রাজ্য নেতৃত্বেরও ঘোষণা করা হয়। দলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, রথিন ঘোষ এবং সাবিনা ইয়াসমিন। সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান এবং সন্দীপন সাহাকে। এছাড়া কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আখরুজ্জামান আনসারিকে। একই সঙ্গে অতীতের আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য নিরীক্ষক নিয়োগের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বিদ্রোহী তৃণমূল শিবির স্পষ্ট বার্তা দিল যে তারা পুরনো নেতৃত্বের ছায়া থেকে বেরিয়ে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গড়তে চায়। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগতদের কাছে ঘটনাটি নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। এক সময় যার নামেই তৃণমূল কংগ্রেসের পরিচয় তৈরি হয়েছিল, রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের দলেই নেতৃত্ব হারাতে হল।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই নতুন নেতৃত্বের অধীনে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারে কি না এবং আগামী দিনে রাজ্যের বিরোধী রাজনীতিতে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
TV Today HD Desk: 






















