ঢাকা ০৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ইরানে আরও ৫০৮ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে কী? Logo বাংলাদেশ-জাপান ৬ চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি Logo যুক্তরাষ্ট্রকে শিক্ষা দিতে যুদ্ধের মূল্য চুকানোর হুঁশিয়ারি ইরানের Logo আইসিসিবিতে শুরু হলো পাঁচ দিনব্যাপী দেশীয় ফার্নিচার মেলা Logo অনিশ্চয়তায় সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম তৈরি, অর্থাভাবে ধুঁকছে গবেষণাকেন্দ্র Logo চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিক পাচার Logo জাপানের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে পোস্টে যা বললেন Logo সমুদ্রবন্দর ও শিল্প পার্ক নির্মাণে পিপিপি মডেল চায় সোজিৎজ ও এনার্জিপ্যাক Logo বিশ্ব জ্বালানির রূপান্তর পারমাণবিক শক্তিকে ছাড়াল বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ Logo পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৬.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান

শিশুকে শাসনে জাপানি পদ্ধতি, ৩ নিয়মে বদলে যেতে পারে আচরণ

  • TV Today HD Desk:
  • আপডেট : ১১:৫১:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
  • ২৮ Time View

শিশুকে শাসনে জাপানি পদ্ধতি, ৩ নিয়মে বদলে যেতে পারে আচরণ

টিভি টুডে ডেস্ক:

সন্তানকে শাসন করার ধরনে সামান্য পরিবর্তনও তার আচরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুদের আচরণ ও বিকাশের ক্ষেত্রে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে ভালো আচরণ শেখানো এবং তা চর্চার সুযোগ করে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে জাপানি অভিভাবকত্বের একটি পদ্ধতি হতে পারে অনুসরণযোগ্য। এর নাম ‘শিতসুকে’ (Shitsuke)।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনপ্রিয় ডিজিটাল মিডিয়া ওয়েবসাইট আপওয়ার্দির এক নিবন্ধে লেখিকা সেসিলি নোবলার বিষয়টি তুলে ধরেন।

শিশুবিষয়ক পেশাগত থেরাপিস্ট এমা হাবার্ড তাঁর ইউটিউব ভিডিওতে এই পদ্ধতিকে ‘জাপানি নিয়ম, যা সবকিছু বদলে দেয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, জাপানি অভিভাবকদের অনুসরণ করা এই সহজ নিয়ম শিশুদের শান্ত, শ্রদ্ধাশীল ও বাধ্য করে তুলতে সহায়তা করে।

‘শিতসুকে’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ শৃঙ্খলা। তবে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে শৃঙ্খলা বলতে যেভাবে শাস্তি বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ বোঝানো হয়, এই পদ্ধতির ধারণা তার থেকে আলাদা। এর মূল লক্ষ্য হলো, শিশুর মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ দেখা দেওয়ার পর শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে আগেভাগেই তাকে সঠিক আচরণ শেখানো।

এমা হাবার্ড বলেন, অনেক অভিভাবকই এমন একটি চক্রে আটকে যান, যেখানে সন্তান খারাপ আচরণ করলে তাঁরা শাস্তি দেন, বকাঝকা করেন কিংবা নানা শর্তের মাধ্যমে তাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু শিতসুকে পদ্ধতি এই চর্চার বিপরীতে কাজ করে।

হাবার্ডের ভাষায়, শাস্তি দেওয়া কিংবা শিশু নিজে থেকেই সব শিখে নেবে, এমন আশা করার পরিবর্তে নির্দেশনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে ভালো আচরণ গড়ে তোলাই এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি। অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ ঘটার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে অভিভাবকেরা সক্রিয়ভাবে সন্তানকে কাঙ্ক্ষিত আচরণ শেখান।

শিশুদের সুশৃঙ্খল করে তুলতে শিতসুকে পদ্ধতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরেছেন হাবার্ড।

১. সন্তানের মধ্যে যে আচরণ দেখতে চান, নিজেও তা অনুসরণ করুন

শিশুরা বড়দের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং তা থেকে শেখে। তাই সন্তানকে শান্ত রাখতে চাইলে নিজেকেও শান্ত থাকতে হবে। তাকে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাতে চাইলে নিজেরাও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করতে হবে, বিশেষ করে বিরক্ত বা রাগান্বিত অবস্থায়।

একইভাবে, সন্তান রেগে গিয়ে চিৎকার করুক, তা না চাইলে অভিভাবকদেরও রাগের সময় চিৎকার করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করতে হবে।

অর্থাৎ, শুধু মুখে ভালো আচরণের শিক্ষা দিলেই হবে না, নিজেদের কাজের মাধ্যমেও তার উদাহরণ তৈরি করতে হবে। কারণ শিশুরা অনেক সময় বড়দের কথার চেয়ে তাঁদের আচরণ দেখে বেশি শেখে।

২. নিয়ম স্পষ্ট রাখুন এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন

শিশুরা কী করবে, কী করবে না এবং তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি। একই সঙ্গে নিয়ম ও দৈনন্দিন রুটিনে ধারাবাহিকতা থাকলে শিশুরা নিজেদের পরিবেশ সম্পর্কে নিরাপদ বোধ করতে পারে।

হাবার্ড বলেন, নিয়ম পালন করতে থাকলেই শিশুরা অসুখী হয়ে পড়ে, এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং স্পষ্ট নিয়মের অভাব তাদের মধ্যে উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

বিষয়টি বোঝাতে তিনি কর্মক্ষেত্রের উদাহরণ দিয়েছেন। কোনো কর্মীকে যদি কখন অফিসে আসতে হবে, কী কাজ করতে হবে কিংবা কখন বৈঠক হবে, তা জানানো না হয়, তাহলে তিনি সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন ও বিভ্রান্ত থাকবেন। স্পষ্ট নিয়ম না থাকলে শিশুরাও একই ধরনের অনিশ্চয়তা অনুভব করতে পারে।

‘সাইকোলজি টুডে’তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মনোবিজ্ঞানের গবেষক জেনালি ডুমও বলেছেন, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক- উভয়ের মস্তিষ্কই পূর্বানুমানযোগ্যতা পছন্দ করে। আকস্মিক আনন্দদায়ক ঘটনা উপভোগ্য হতে পারে, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে পরিচিত রুটিন মানুষকে নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করে। বিপরীতে, অনিশ্চয়তা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।

শিশুর মধ্যে নিরাপত্তাবোধ গড়ে তুলতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার মতো অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

৩. দুষ্টুমি নয়, শেখার সুযোগ হিসেবে দেখুন

শিতসুকে পদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণকে শুধু দুষ্টুমি হিসেবে বিবেচনা না করে সেটিকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা।

সন্তান কোনো ভুল করলে শুধু ‘এটা করো না’ কিংবা ‘দুষ্টুমি বন্ধ করো’ বলার পরিবর্তে অভিভাবকদের নিজেদের একটি প্রশ্ন করা উচিত-এই পরিস্থিতিতে শিশুটির কোন দক্ষতাটি শেখা প্রয়োজন?

এই দৃষ্টিভঙ্গি শিশুর ভুলকে শিক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে সাহায্য করে। কারণ শিশুরা বেড়ে ওঠার পথে ভুল করবেই। সেই ভুলের জন্য কেবল শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে কেন এমন আচরণ হয়েছে এবং কীভাবে পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে সামলানো যায়, তা শেখানো বেশি কার্যকর হতে পারে।

হাবার্ড বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের জন্য শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে শিশুর যে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, সেটি শেখানোর দিকে মনোযোগ দিলে আচরণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে। এতে শিশু শুধু কোন কাজটি করা যাবে না, তা-ই জানে না; বরং সঠিকভাবে কী করতে হবে, সেটিও শিখতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো শিশু রেগে গিয়ে চিৎকার করলে তাকে শুধু চুপ করতে বলার পরিবর্তে নিজের রাগ কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, তা শেখানো যেতে পারে। একইভাবে, কোনো পোষা প্রাণীর সঙ্গে রূঢ় আচরণ করলে তাকে বকাঝকা করার পাশাপাশি প্রাণীটিকে কীভাবে কোমলভাবে আদর করতে হয়, তা দেখিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

শিশুদের ভালো আচরণের স্বীকৃতি দেওয়াও জরুরি

হাবার্ডের ভিডিওটি ইউটিউবে প্রায় ১০ লাখবার দেখা হয়েছে। ভিডিওটির মন্তব্যে অনেকেই শিশুদের আচরণ গঠনে ইতিবাচক স্বীকৃতি ও নিয়মের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

জাপানে বেড়ে ওঠা এক মন্তব্যকারী জানান, শৈশবে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রতিবেশী থেকে শুরু করে পরিচিত দোকানদার—অনেক প্রাপ্তবয়স্কই তাঁর ভদ্র আচরণকে স্বীকৃতি দিতেন। কাউকে ‘সুপ্রভাত’ বলা কিংবা ‘ধন্যবাদ’ দেওয়ার পর বড়দের কাছ থেকে সম্মানজনক প্রতিক্রিয়া পাওয়া তাঁর কাছে আনন্দদায়ক ছিল।

ওই মন্তব্যকারীর মতে, শিশুদের ভালো আচরণের চেষ্টা চোখে পড়লে তাদের প্রশংসা করা এবং সেই আচরণের জন্য ধন্যবাদ জানানো উচিত। এতে তারা নিজেদের আচরণের ইতিবাচক মূল্য বুঝতে পারে।

একজন শিক্ষকও মন্তব্যে বলেছেন, শিশুরা নিয়মের ধারাবাহিকতা পছন্দ করে। তাদের প্রত্যাশা থাকে, শিক্ষকও নিয়ম মেনে চলবেন এবং নিয়ম ভাঙলে নির্ধারিত পরিণতি কার্যকর করবেন। তাঁর মতে, পূর্বানুমানযোগ্যতা শিশুদের স্বস্তি দেয়।

নেতিবাচক নির্দেশনার বদলে ইতিবাচক ভাষা ব্যবহার করুন

শিশুকে নির্দেশনা দেওয়ার সময় শব্দের ব্যবহারেও পরিবর্তন আনা যেতে পারে বলে মনে করেন আরেক মন্তব্যকারী।

যেমন, ‘ভুলে যেয়ো না’ বলার পরিবর্তে ‘মনে রেখো’ বলা যেতে পারে। একইভাবে, ‘বিড়ালের লেজ টেনো না’ বলার পরিবর্তে ‘বিড়ালটিকে আলতো করে আদর করো’ বলা যেতে পারে।

এভাবে শিশুকে কী করা উচিত নয়, শুধু তা না বলে ঠিক কী করতে হবে, সেটি ইতিবাচক ভাষায় বোঝানো যায়। এতে নির্দেশনা আরও স্পষ্ট হয় এবং শিশু কাঙ্ক্ষিত আচরণ সম্পর্কে ধারণা পায়।

মূলত, শিতসুকে পদ্ধতির মূল শিক্ষা হলো, শিশুকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তুলতে শুধু শাস্তি বা নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। অভিভাবকদের নিজেদের আচরণে উদাহরণ তৈরি করা, স্পষ্ট নিয়ম বজায় রাখা এবং ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে শিশুর মধ্যে ভালো আচরণ ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করা সম্ভব।

–টিভি টুডে

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে আরও ৫০৮ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে কী?

শিশুকে শাসনে জাপানি পদ্ধতি, ৩ নিয়মে বদলে যেতে পারে আচরণ

আপডেট : ১১:৫১:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

শিশুকে শাসনে জাপানি পদ্ধতি, ৩ নিয়মে বদলে যেতে পারে আচরণ

টিভি টুডে ডেস্ক:

সন্তানকে শাসন করার ধরনে সামান্য পরিবর্তনও তার আচরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুদের আচরণ ও বিকাশের ক্ষেত্রে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে ভালো আচরণ শেখানো এবং তা চর্চার সুযোগ করে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে জাপানি অভিভাবকত্বের একটি পদ্ধতি হতে পারে অনুসরণযোগ্য। এর নাম ‘শিতসুকে’ (Shitsuke)।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনপ্রিয় ডিজিটাল মিডিয়া ওয়েবসাইট আপওয়ার্দির এক নিবন্ধে লেখিকা সেসিলি নোবলার বিষয়টি তুলে ধরেন।

শিশুবিষয়ক পেশাগত থেরাপিস্ট এমা হাবার্ড তাঁর ইউটিউব ভিডিওতে এই পদ্ধতিকে ‘জাপানি নিয়ম, যা সবকিছু বদলে দেয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, জাপানি অভিভাবকদের অনুসরণ করা এই সহজ নিয়ম শিশুদের শান্ত, শ্রদ্ধাশীল ও বাধ্য করে তুলতে সহায়তা করে।

‘শিতসুকে’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ শৃঙ্খলা। তবে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে শৃঙ্খলা বলতে যেভাবে শাস্তি বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ বোঝানো হয়, এই পদ্ধতির ধারণা তার থেকে আলাদা। এর মূল লক্ষ্য হলো, শিশুর মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ দেখা দেওয়ার পর শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে আগেভাগেই তাকে সঠিক আচরণ শেখানো।

এমা হাবার্ড বলেন, অনেক অভিভাবকই এমন একটি চক্রে আটকে যান, যেখানে সন্তান খারাপ আচরণ করলে তাঁরা শাস্তি দেন, বকাঝকা করেন কিংবা নানা শর্তের মাধ্যমে তাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু শিতসুকে পদ্ধতি এই চর্চার বিপরীতে কাজ করে।

হাবার্ডের ভাষায়, শাস্তি দেওয়া কিংবা শিশু নিজে থেকেই সব শিখে নেবে, এমন আশা করার পরিবর্তে নির্দেশনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে ভালো আচরণ গড়ে তোলাই এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি। অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ ঘটার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে অভিভাবকেরা সক্রিয়ভাবে সন্তানকে কাঙ্ক্ষিত আচরণ শেখান।

শিশুদের সুশৃঙ্খল করে তুলতে শিতসুকে পদ্ধতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরেছেন হাবার্ড।

১. সন্তানের মধ্যে যে আচরণ দেখতে চান, নিজেও তা অনুসরণ করুন

শিশুরা বড়দের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং তা থেকে শেখে। তাই সন্তানকে শান্ত রাখতে চাইলে নিজেকেও শান্ত থাকতে হবে। তাকে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাতে চাইলে নিজেরাও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করতে হবে, বিশেষ করে বিরক্ত বা রাগান্বিত অবস্থায়।

একইভাবে, সন্তান রেগে গিয়ে চিৎকার করুক, তা না চাইলে অভিভাবকদেরও রাগের সময় চিৎকার করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করতে হবে।

অর্থাৎ, শুধু মুখে ভালো আচরণের শিক্ষা দিলেই হবে না, নিজেদের কাজের মাধ্যমেও তার উদাহরণ তৈরি করতে হবে। কারণ শিশুরা অনেক সময় বড়দের কথার চেয়ে তাঁদের আচরণ দেখে বেশি শেখে।

২. নিয়ম স্পষ্ট রাখুন এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন

শিশুরা কী করবে, কী করবে না এবং তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি। একই সঙ্গে নিয়ম ও দৈনন্দিন রুটিনে ধারাবাহিকতা থাকলে শিশুরা নিজেদের পরিবেশ সম্পর্কে নিরাপদ বোধ করতে পারে।

হাবার্ড বলেন, নিয়ম পালন করতে থাকলেই শিশুরা অসুখী হয়ে পড়ে, এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং স্পষ্ট নিয়মের অভাব তাদের মধ্যে উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

বিষয়টি বোঝাতে তিনি কর্মক্ষেত্রের উদাহরণ দিয়েছেন। কোনো কর্মীকে যদি কখন অফিসে আসতে হবে, কী কাজ করতে হবে কিংবা কখন বৈঠক হবে, তা জানানো না হয়, তাহলে তিনি সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন ও বিভ্রান্ত থাকবেন। স্পষ্ট নিয়ম না থাকলে শিশুরাও একই ধরনের অনিশ্চয়তা অনুভব করতে পারে।

‘সাইকোলজি টুডে’তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মনোবিজ্ঞানের গবেষক জেনালি ডুমও বলেছেন, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক- উভয়ের মস্তিষ্কই পূর্বানুমানযোগ্যতা পছন্দ করে। আকস্মিক আনন্দদায়ক ঘটনা উপভোগ্য হতে পারে, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে পরিচিত রুটিন মানুষকে নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করে। বিপরীতে, অনিশ্চয়তা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।

শিশুর মধ্যে নিরাপত্তাবোধ গড়ে তুলতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার মতো অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

৩. দুষ্টুমি নয়, শেখার সুযোগ হিসেবে দেখুন

শিতসুকে পদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণকে শুধু দুষ্টুমি হিসেবে বিবেচনা না করে সেটিকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা।

সন্তান কোনো ভুল করলে শুধু ‘এটা করো না’ কিংবা ‘দুষ্টুমি বন্ধ করো’ বলার পরিবর্তে অভিভাবকদের নিজেদের একটি প্রশ্ন করা উচিত-এই পরিস্থিতিতে শিশুটির কোন দক্ষতাটি শেখা প্রয়োজন?

এই দৃষ্টিভঙ্গি শিশুর ভুলকে শিক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে সাহায্য করে। কারণ শিশুরা বেড়ে ওঠার পথে ভুল করবেই। সেই ভুলের জন্য কেবল শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে কেন এমন আচরণ হয়েছে এবং কীভাবে পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে সামলানো যায়, তা শেখানো বেশি কার্যকর হতে পারে।

হাবার্ড বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের জন্য শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে শিশুর যে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, সেটি শেখানোর দিকে মনোযোগ দিলে আচরণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে। এতে শিশু শুধু কোন কাজটি করা যাবে না, তা-ই জানে না; বরং সঠিকভাবে কী করতে হবে, সেটিও শিখতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো শিশু রেগে গিয়ে চিৎকার করলে তাকে শুধু চুপ করতে বলার পরিবর্তে নিজের রাগ কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, তা শেখানো যেতে পারে। একইভাবে, কোনো পোষা প্রাণীর সঙ্গে রূঢ় আচরণ করলে তাকে বকাঝকা করার পাশাপাশি প্রাণীটিকে কীভাবে কোমলভাবে আদর করতে হয়, তা দেখিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

শিশুদের ভালো আচরণের স্বীকৃতি দেওয়াও জরুরি

হাবার্ডের ভিডিওটি ইউটিউবে প্রায় ১০ লাখবার দেখা হয়েছে। ভিডিওটির মন্তব্যে অনেকেই শিশুদের আচরণ গঠনে ইতিবাচক স্বীকৃতি ও নিয়মের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

জাপানে বেড়ে ওঠা এক মন্তব্যকারী জানান, শৈশবে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রতিবেশী থেকে শুরু করে পরিচিত দোকানদার—অনেক প্রাপ্তবয়স্কই তাঁর ভদ্র আচরণকে স্বীকৃতি দিতেন। কাউকে ‘সুপ্রভাত’ বলা কিংবা ‘ধন্যবাদ’ দেওয়ার পর বড়দের কাছ থেকে সম্মানজনক প্রতিক্রিয়া পাওয়া তাঁর কাছে আনন্দদায়ক ছিল।

ওই মন্তব্যকারীর মতে, শিশুদের ভালো আচরণের চেষ্টা চোখে পড়লে তাদের প্রশংসা করা এবং সেই আচরণের জন্য ধন্যবাদ জানানো উচিত। এতে তারা নিজেদের আচরণের ইতিবাচক মূল্য বুঝতে পারে।

একজন শিক্ষকও মন্তব্যে বলেছেন, শিশুরা নিয়মের ধারাবাহিকতা পছন্দ করে। তাদের প্রত্যাশা থাকে, শিক্ষকও নিয়ম মেনে চলবেন এবং নিয়ম ভাঙলে নির্ধারিত পরিণতি কার্যকর করবেন। তাঁর মতে, পূর্বানুমানযোগ্যতা শিশুদের স্বস্তি দেয়।

নেতিবাচক নির্দেশনার বদলে ইতিবাচক ভাষা ব্যবহার করুন

শিশুকে নির্দেশনা দেওয়ার সময় শব্দের ব্যবহারেও পরিবর্তন আনা যেতে পারে বলে মনে করেন আরেক মন্তব্যকারী।

যেমন, ‘ভুলে যেয়ো না’ বলার পরিবর্তে ‘মনে রেখো’ বলা যেতে পারে। একইভাবে, ‘বিড়ালের লেজ টেনো না’ বলার পরিবর্তে ‘বিড়ালটিকে আলতো করে আদর করো’ বলা যেতে পারে।

এভাবে শিশুকে কী করা উচিত নয়, শুধু তা না বলে ঠিক কী করতে হবে, সেটি ইতিবাচক ভাষায় বোঝানো যায়। এতে নির্দেশনা আরও স্পষ্ট হয় এবং শিশু কাঙ্ক্ষিত আচরণ সম্পর্কে ধারণা পায়।

মূলত, শিতসুকে পদ্ধতির মূল শিক্ষা হলো, শিশুকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তুলতে শুধু শাস্তি বা নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। অভিভাবকদের নিজেদের আচরণে উদাহরণ তৈরি করা, স্পষ্ট নিয়ম বজায় রাখা এবং ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে শিশুর মধ্যে ভালো আচরণ ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করা সম্ভব।

–টিভি টুডে