
চোখ রাঙাচ্ছে ঢাকার বাইরে ও নতুন স্পটে আগ্রাসি ডেঙ্গু
-শেখ নূর ইসলাম
ডেঙ্গুজ্বর একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিক্টাস প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ায়, রোগটি বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, সঠিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধই জটিলতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ডেঙ্গুর সংক্রমন শুধু রাজধানী ঢাকায় সীমাবদ্ধ নেই। ঢাকার বাইরে ও কয়েকটি জেলায় উল্লেখযোগ্যহারে রোগী বাড়ছে। খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, গোপালগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জে ক্রমশ বাড়ছে রোগী। তবে এর মধ্যে টাঙ্গাইল যেন হয়ে উঠছে ডেঙ্গুর চোখ রাঙানো নতুন হটস্পট।
ঢাকার সীমানা ছাড়িয়ে নতুন এ জেলাগুলোয় আগ্রাসি হয়ে উঠছে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ।
ছড়িয়ে পড়া এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন দুই হাজারের বেশি রোগী। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। আর মারা গেছেন ৩১৬ জন।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর)‘পূর্বাভাসে দেখা গেছে টাঙ্গাইল ডেঙ্গুর নতুন হটস্পট হয়ে উঠছে। ঢাকার কাছাকাছি নারায়ণগঞ্জ ডেঙ্গুর অন্যতম হটস্পট। এর বাইরে খুলনা, বাগেরহাটে রোগীর সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। এসব এলাকার বদ্ধ জলাধারে বাড়ছে এডিসের লার্ভা। ঝালকাঠিতেও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে’।
প্রতিনিয়ত ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ছে বিভিন্ন জেলায়। এর মধ্যে টাঙ্গাইলে ডেঙ্গু পরিস্থিতির বেশি অবনতি হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। ডেঙ্গু রোগীর জন্য প্রতিটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচটি করে শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। টাঙ্গাইল সদর জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার ৩৩ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এ জেলায় ১ হাজার ৫৯৯ জন সরকারি হাসপাতালে এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৩৮৯ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ পর্যন্ত মারা গেছের তিনজন। টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. ফরাজী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম এর সূত্রে জানা যায় ‘ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। জেলার সব হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও গুরুত্বের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
এ দিকে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠি জেলাকে ডেঙ্গুর রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত সোমবার জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ২২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে জেলার চারটি হাসপাতালে ২ হাজার ৩৬১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন।
ঝালকাঠির সিভিল সার্জনের তথ্যমতে, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এসব ওয়ার্ডে রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
সিভিল সার্জন আরও জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে মশা নিধনের ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।
বাগেরহাট থেকে আবুল হোসেন জানান, গত ২৩ জুলাই থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ২১১ জন। সরকারি হিসাবে এ সময়ে ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার জানান, বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ২৫টি শয্যা রয়েছে। গত চার মাস ধরে এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন।
বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাহবুবুল আলম ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানান।
ডেঙ্গুর প্রকোপ, এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘রাজধানীকে কেন্দ্র করে তৈরি করা একটি পরিকল্পনা দিয়ে পুরো দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক ঝুঁকি মানচিত্র। কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোথায় কোন ধরনের প্রজননস্থল বেশি, কোন মৌসুমে ঝুঁকি বাড়ে, কোন কীটনাশক কার্যকর এবং কোথায় কীটনাশক প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ঢাকার জন্য যে কৌশল কার্যকর, সেটি প্রত্যন্ত জেলার জন্যও একইভাবে কার্যকর হবে- এমন ধারণা বৈজ্ঞানিক নয়।’
হাসপাতালে ভর্তি রোগী ১ লাখ ছাড়াল :
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) ডেঙ্গুজ্বরে মারা গেছেন নয়জন।
এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে তিনজন, ঢাকা উত্তর সিটি এলাকার হাসপাতালে দুজন, চট্টগ্রাম বিভাগে একজন, খুলনা বিভাগে দুজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে একজন মারা গেছেন।
চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৩৯৬ জন। একই সময়ে এ রোগে মারা গেছেন ৩১৬ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়ার পেছনে স্থানীয় পরিবেশ, পানি সংরক্ষণ, ঘনবসতি ও এডিস মশার প্রজননস্থলের বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
–টিভি টুডে
TV Today HD Desk: 





















