ঢাকা ১০:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ইরানে আরও ৫০৮ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে কী? Logo বাংলাদেশ-জাপান ৬ চুক্তি স্বাক্ষর, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি Logo যুক্তরাষ্ট্রকে শিক্ষা দিতে যুদ্ধের মূল্য চুকানোর হুঁশিয়ারি ইরানের Logo আইসিসিবিতে শুরু হলো পাঁচ দিনব্যাপী দেশীয় ফার্নিচার মেলা Logo অনিশ্চয়তায় সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম তৈরি, অর্থাভাবে ধুঁকছে গবেষণাকেন্দ্র Logo চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিক পাচার Logo জাপানের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে পোস্টে যা বললেন Logo সমুদ্রবন্দর ও শিল্প পার্ক নির্মাণে পিপিপি মডেল চায় সোজিৎজ ও এনার্জিপ্যাক Logo বিশ্ব জ্বালানির রূপান্তর পারমাণবিক শক্তিকে ছাড়াল বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ Logo পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৬.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান

আবাসন খাতের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর কাছে রিহ্যাবের ৬দফা প্রস্তাব

  • TV Today HD Desk:
  • আপডেট : ১১:৫৬:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
  • ৭০ Time View

আবাসন খাতের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর কাছে রিহ্যাবের ৬দফা প্রস্তাব

পরিকল্পিত নগরায়ণ বিনির্মাণে প্রয়োজন দেশের আবাসন খাতের উন্নয়ন,এবং সাধারণ মানুষের আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে ৬দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে ‘রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (রিহ্যাব)। এ উপলক্ষ্যে রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড আলী আফজাল আবাসঙ্খাতের উদ্যোক্তাদের সাথে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ করে ৬টি দাবি সম্মিলিত প্রস্তাবনা উপাস্থাপন করেন।

বুধবার (২২ জুলাই) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাক্ষাতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, ও মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া (দিপু), এমপিসহ অনান্যা নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল বলেন, রিহ্যাব সরকার স্বীকৃত দেশের একমাত্র আবাসন খাতের ট্রেডবডি হিসেবে গত ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন উন্নয়নে কাজ করে আসছে।

ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বর্তমানে এ খাতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং জিডিপিতে এ খাতের ১৫% অবদান রয়েছে। পাশাপাশি সিমেন্ট, রড, ইট, সিরামিক, টাইলস, কাচ, রং, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, স্যানিটারি, ফার্নিচার, পরিবহনসহ ৩০০-এর বেশি লিংকেজ শিল্প আবাসন খাতকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেসব প্রস্তাবনা তুলে ধরেন, তার মধ্যে রয়েছে—

১। পরিকল্পিত বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় ভূমি জোনিং নীতিমালা প্রণয়ন ।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সীমিত ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ২১০০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য জনসংখ্যা, নগরায়ণ, আবাসনের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় ভূমি জোনিং নীতিমালা প্রণয়ন খুবই জরুরী। সারা দেশের জমিকে কৃষি, বনাঞ্চল, জলাশয়, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্পাঞ্চল ও সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে শ্রেণিবিন্যাস করতে হবে এবং প্রতিটি জোনের জন্য পৃথক ব্যবহারবিধি নির্ধারণ করতে হবে। এতে অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহার রোধ হবে, কৃষিজমি, শিল্পায়ন ও আবাসন উন্নয়ন সুশৃঙ্খল হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা সহজ হবে। পরিকল্পিত ও উলম্ব (Vertical) নগরায়ণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। সেই বাস্তবতায় বর্তমান ড্যাপ (DAP) ও নির্মাণ বিধিমালা পুনর্মূল্যায়ন ও যুগোপযোগী সংস্কার করা প্রয়োজন।

২। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্য পিপিপি ভিত্তিক আবাসন কর্মসূচি।
নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত নাগরিকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে ফ্ল্যাট ও আবাসন নির্মাণ কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করছি। সরকারের জমি, নীতিগত সহায়তা ও বেসরকারি খাতের দক্ষতা ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

৩। মধ্যবিত্তের জন্য সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি হাউজিং লোন চালু।
দেশের মধ্যবিত্ত মানুষের নিজস্ব আবাসনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি হাউজিং লোনের একটি বিশেষ স্কিম চালুর সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি। উন্নত বিশ্বের মতো সহজ শর্তে গৃহঋণ চালু হলে লাখো পরিবার নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসনের সুযোগ পাবে এবং আবাসন খাতেও ইতিবাচক গতি সঞ্চার হবে।

৪। নিবন্ধন ব্যয়, ভ্যাট ও কর কাঠামো যৌক্তিকীকরণ।
আমাদের দেশের নিবন্ধন ব্যয় এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। মালয়েশিয়া, চায়না, থাইল্যান্ড ও হংকং এর মত আমাদের দেশের নিবন্ধন ব্যয় ৫ শতাংশ করার জন্য অনুরোধ করছি। করের হার বাস্তবসম্মত হলে ক্রেতারা প্রকৃত লেনদেনমূল্য নিবন্ধনে উৎসাহিত হবেন ও অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টির প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। আমরা বিশ্বাস করি, কর ছাড়া একটি দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়, তবে করব্যবস্থা হওয়া উচিত বাস্তবসম্মত, বিনিয়োগবান্ধব, ন্যায়সংগত, ঝামেলামুক্ত ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল।

৫। জমির মালিকদের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ মূলধনী কর প্রত্যাহার।
চলতি অর্থবছরে জমির মালিকদের ওপর ফ্ল্যাট নির্মাণে আরোপিত ১৫ শতাংশ মূলধনী কর প্রত্যাহারের জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। একজন ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে আর্থিক সুবিধা অর্জনের আগেই এই করের দায় সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের মূল্য বৃদ্ধি করে সাধারণ ক্রেতার আবাসন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৬। পরিকল্পনা অনুমোদন প্রক্রিয়ার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন।
বিল্ডিং তৈরির প্ল্যান অনুমোদন এবং জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ কমাতে প্ল্যান পাস-সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি। এতে সেবা হবে দ্রুত, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং হয়রানিমুক্ত, যা আবাসন খাতের উন্নয়নকে আরও গতিশীল করবে।

ড. আফজাল তাঁর বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীকে জানান, রিহ্যাব সবসময় সরকারের উন্নয়ন অভিযাত্রার দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে কাজ করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও করতে আগ্রহী। এসব প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে আবাসন খাত আরও গতিশীল হবে এবং মধ্যবিত্তের আবাসনের স্বপ্ন পূরণ সহজ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সাক্ষাৎ শেষে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর সদয় বিবেচনা ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা কামনা করেন।

আলোচনা পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের আবাসন শিল্প জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এ খাতের বিকাশ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এমন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে আবাসন খাতের উন্নয়ন হবে পরিকল্পিত, টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নগরায়ণ শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক হলে চলবে না; দেশের অন্যান্য অঞ্চলকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি জমি রক্ষা করে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও  বলেন, রাজউক বা  সরকার নিজে আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করুক—এমনটি তিনি চান না। বরং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) ভিত্তিক আবাসন কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজালের বক্তব্য ও প্রস্তাবনাগুলো শোনেন। তিনি উপস্থাপিত যৌক্তিক দাবিগুলো ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

পূর্ব নির্ধারিত সাক্ষাতে রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ আবু খালিদ মো. বরকাতউল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. মো. হারুন অর রশিদ, ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল করিম সিদ্দিকী, ইউনাইটেড গ্রুপের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজামউদ্দিন হাসান রশিদ, ইউনাইটেড গ্রুপের ম্যানেজার মুশফিকুল আলম খন্দকার, রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. লিয়াকত আলী খান, রূপায়ণ গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান মাহির আলী খান রাতুল, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম মো. রেজাউল করিম, ইউএস-বাংলা অ্যাসেটস লিমিটেডের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জালাল ঘানি খান, স্বদেশ প্রপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. এ. কাইয়ুম এবং এবং সেঞ্চুরি গ্রুপের চেয়ারম্যান এমজিআর নাসির মজুমদার  উপস্থিত ছিলেন।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে আরও ৫০৮ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ পাঠাচ্ছে রাশিয়া, নেপথ্যে কী?

আবাসন খাতের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর কাছে রিহ্যাবের ৬দফা প্রস্তাব

আপডেট : ১১:৫৬:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

আবাসন খাতের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর কাছে রিহ্যাবের ৬দফা প্রস্তাব

পরিকল্পিত নগরায়ণ বিনির্মাণে প্রয়োজন দেশের আবাসন খাতের উন্নয়ন,এবং সাধারণ মানুষের আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে ৬দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে ‘রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (রিহ্যাব)। এ উপলক্ষ্যে রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড আলী আফজাল আবাসঙ্খাতের উদ্যোক্তাদের সাথে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ করে ৬টি দাবি সম্মিলিত প্রস্তাবনা উপাস্থাপন করেন।

বুধবার (২২ জুলাই) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাক্ষাতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, ও মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া (দিপু), এমপিসহ অনান্যা নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল বলেন, রিহ্যাব সরকার স্বীকৃত দেশের একমাত্র আবাসন খাতের ট্রেডবডি হিসেবে গত ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন উন্নয়নে কাজ করে আসছে।

ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বর্তমানে এ খাতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং জিডিপিতে এ খাতের ১৫% অবদান রয়েছে। পাশাপাশি সিমেন্ট, রড, ইট, সিরামিক, টাইলস, কাচ, রং, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, স্যানিটারি, ফার্নিচার, পরিবহনসহ ৩০০-এর বেশি লিংকেজ শিল্প আবাসন খাতকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেসব প্রস্তাবনা তুলে ধরেন, তার মধ্যে রয়েছে—

১। পরিকল্পিত বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় ভূমি জোনিং নীতিমালা প্রণয়ন ।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সীমিত ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ২১০০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য জনসংখ্যা, নগরায়ণ, আবাসনের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় ভূমি জোনিং নীতিমালা প্রণয়ন খুবই জরুরী। সারা দেশের জমিকে কৃষি, বনাঞ্চল, জলাশয়, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্পাঞ্চল ও সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে শ্রেণিবিন্যাস করতে হবে এবং প্রতিটি জোনের জন্য পৃথক ব্যবহারবিধি নির্ধারণ করতে হবে। এতে অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহার রোধ হবে, কৃষিজমি, শিল্পায়ন ও আবাসন উন্নয়ন সুশৃঙ্খল হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা সহজ হবে। পরিকল্পিত ও উলম্ব (Vertical) নগরায়ণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। সেই বাস্তবতায় বর্তমান ড্যাপ (DAP) ও নির্মাণ বিধিমালা পুনর্মূল্যায়ন ও যুগোপযোগী সংস্কার করা প্রয়োজন।

২। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্য পিপিপি ভিত্তিক আবাসন কর্মসূচি।
নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত নাগরিকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে ফ্ল্যাট ও আবাসন নির্মাণ কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করছি। সরকারের জমি, নীতিগত সহায়তা ও বেসরকারি খাতের দক্ষতা ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

৩। মধ্যবিত্তের জন্য সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি হাউজিং লোন চালু।
দেশের মধ্যবিত্ত মানুষের নিজস্ব আবাসনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি হাউজিং লোনের একটি বিশেষ স্কিম চালুর সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি। উন্নত বিশ্বের মতো সহজ শর্তে গৃহঋণ চালু হলে লাখো পরিবার নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসনের সুযোগ পাবে এবং আবাসন খাতেও ইতিবাচক গতি সঞ্চার হবে।

৪। নিবন্ধন ব্যয়, ভ্যাট ও কর কাঠামো যৌক্তিকীকরণ।
আমাদের দেশের নিবন্ধন ব্যয় এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। মালয়েশিয়া, চায়না, থাইল্যান্ড ও হংকং এর মত আমাদের দেশের নিবন্ধন ব্যয় ৫ শতাংশ করার জন্য অনুরোধ করছি। করের হার বাস্তবসম্মত হলে ক্রেতারা প্রকৃত লেনদেনমূল্য নিবন্ধনে উৎসাহিত হবেন ও অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টির প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। আমরা বিশ্বাস করি, কর ছাড়া একটি দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়, তবে করব্যবস্থা হওয়া উচিত বাস্তবসম্মত, বিনিয়োগবান্ধব, ন্যায়সংগত, ঝামেলামুক্ত ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল।

৫। জমির মালিকদের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ মূলধনী কর প্রত্যাহার।
চলতি অর্থবছরে জমির মালিকদের ওপর ফ্ল্যাট নির্মাণে আরোপিত ১৫ শতাংশ মূলধনী কর প্রত্যাহারের জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। একজন ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে আর্থিক সুবিধা অর্জনের আগেই এই করের দায় সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের মূল্য বৃদ্ধি করে সাধারণ ক্রেতার আবাসন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৬। পরিকল্পনা অনুমোদন প্রক্রিয়ার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন।
বিল্ডিং তৈরির প্ল্যান অনুমোদন এবং জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ কমাতে প্ল্যান পাস-সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি। এতে সেবা হবে দ্রুত, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং হয়রানিমুক্ত, যা আবাসন খাতের উন্নয়নকে আরও গতিশীল করবে।

ড. আফজাল তাঁর বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীকে জানান, রিহ্যাব সবসময় সরকারের উন্নয়ন অভিযাত্রার দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে কাজ করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও করতে আগ্রহী। এসব প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে আবাসন খাত আরও গতিশীল হবে এবং মধ্যবিত্তের আবাসনের স্বপ্ন পূরণ সহজ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সাক্ষাৎ শেষে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর সদয় বিবেচনা ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা কামনা করেন।

আলোচনা পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের আবাসন শিল্প জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এ খাতের বিকাশ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এমন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে আবাসন খাতের উন্নয়ন হবে পরিকল্পিত, টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নগরায়ণ শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক হলে চলবে না; দেশের অন্যান্য অঞ্চলকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি জমি রক্ষা করে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও  বলেন, রাজউক বা  সরকার নিজে আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করুক—এমনটি তিনি চান না। বরং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) ভিত্তিক আবাসন কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজালের বক্তব্য ও প্রস্তাবনাগুলো শোনেন। তিনি উপস্থাপিত যৌক্তিক দাবিগুলো ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

পূর্ব নির্ধারিত সাক্ষাতে রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ আবু খালিদ মো. বরকাতউল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. মো. হারুন অর রশিদ, ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল করিম সিদ্দিকী, ইউনাইটেড গ্রুপের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজামউদ্দিন হাসান রশিদ, ইউনাইটেড গ্রুপের ম্যানেজার মুশফিকুল আলম খন্দকার, রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. লিয়াকত আলী খান, রূপায়ণ গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান মাহির আলী খান রাতুল, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম মো. রেজাউল করিম, ইউএস-বাংলা অ্যাসেটস লিমিটেডের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জালাল ঘানি খান, স্বদেশ প্রপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. এ. কাইয়ুম এবং এবং সেঞ্চুরি গ্রুপের চেয়ারম্যান এমজিআর নাসির মজুমদার  উপস্থিত ছিলেন।