
এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে দলবদ্ধ ধর্ষণ: ১ জনের মৃত্যুদণ্ড যাবজ্জীবন ৩ জনের
প্রায় ছয় বছর আগে সিলেটের বহুল আলোচিত এমসি কলেজ (মুরারিচাঁদ কলেজ, সিলেট) ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে এক তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় অপর চার আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুর ২টায় সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ রায় ঘোষণা করেন। বেলা ১২টা ২০ মিনিটে তিনি এজলাসে বসেন। অতপর বিচারক ওই মামলার রায় পড়া শুরু করেন। দুপুর ১টা ৫৩মিনিটে তিনি রায় ঘোষণা করেন।
আদালত সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জানা যায়, মামলায় ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের ভিত্তিতে আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।
সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন জানান, রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমানকে। এ ছাড়া শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুর রহমান ওরফে তারেক ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সাজাপ্রাপ্ত, তাদের প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। অপর আরেকটি ধারায় ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। উভয় সাজা একসঙ্গে ভোগ করবেন বলে উল্লেখ করেন আদালতের বিচারক। অন্য চার আসামিকে অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার আগে বিচারক বিচারক ৯১ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ পড়ে শোনান।
আলোচিত এই দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণার জন্য সকাল সাড়ে ১১টায় সময় আট আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
এর আগে গত বুধবার আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ১৪ জুলাই রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন আদালত।
এজলাস সূত্র জানায়, গত বছরের মে মাসে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের পর সাক্ষ্যগ্রহণকালে মোট ২৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে পাশবিক নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ ও তার স্বামী, আসামিদের জবানবন্দি গ্রহণকারী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের এক অধ্যাপক এবং ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক। তবে সাক্ষ্যগ্রহণকালে বাদীর বিভ্রান্তিমূলক সাক্ষ্য দেওয়া নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ।
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ঘটে নারকীয় এই ঘটনা। ওইদিন সন্ধ্যায় ছাত্রাবাস এলাকায় ঘুরতে যান এক নবদম্পতি। সে সময় স্বামীকে আটকে রেখে নববিবাহিত তরুণীকে (২০) দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়।
মামলার এজাহারের বর্ণনামতে, ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে স্বামীকে নিয়ে শাহপরান মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন নির্যাতনের শিকার তরুণী (২০)। ফেরার সময় তারা গাড়ি থামিয়েছিলেন নগরের টিলাগড় এলাকার এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে। স্ত্রীকে প্রাইভেটকারে রেখে স্বামী পার্শ্ববর্তী দোকানে গিয়েছিলেন। ওই সময় প্রাইভেটকারটি ঘিরে ধরে কয়েকজন তরুণ। প্রাইভেটকারসহ ওই দম্পতিকে তারা নিয়ে যায় বালুচর এলাকার এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ভেতরে। সেখানে স্বামীর সামনেই গাড়ির ভেতর সংঘবদ্ধভাবে তরুণীকে ধর্ষণ করে ছয় তরুণ। পরে তাদের মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয় ধর্ষকরা। আটকে রাখে তাদের গাড়িও।
ঘটনার রাতেই নির্যাতিতার স্বামী বাদী হয়ে নগরের শাহপরান থানায় ভুক্তভোগীর স্বামী বাদী হয়ে এমসি কলেজ ছাত্রলীগের ছয়জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে এবং দুজনকে অজ্ঞাত আসামি করে এসএমসপির শাহপরান থানায় মামলা করেন। প্রাইভেটকারটি আটকে রেখে চাঁদাবাজির ঘটনায় আরেকটি মামলা হয়। মামলা দু’টি প্রথমে পৃথক চললেও পরবর্তীতে উভয় মামলা একসঙ্গে চলার সিদ্ধান্ত হয়।
ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিনদিনের মধ্যে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে সন্দেহভাজন দু’জন ও এজাহারনামীয় ছয়জনসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা পরবর্তীতে আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এছাড়াও ডিএনএ পরীক্ষায় আট আসামির ছয়জনের সঙ্গে ধর্ষণের আলামতের মিল পাওয়া যায়।
২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য গ্রেপ্তারকৃত আট আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন।
২০২১ সালের ১০ জানুয়ারি আদালত এই মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচারকার্য শুরু করেন। পরবর্তীতে মোট ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে এ রায় ঘোষণা করা হয়।
TV Today HD Desk: 
























