ঢাকা ০৪:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo আজ ও গাজীপুরে দুইশতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা Logo যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চার মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১১.৫১ শতাংশ Logo এক দিনেই সারাদেশে ৫২৯ পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা Logo আইসিসিবি ফার্নিচার মেলায় রিল্যাক্সজিন চেয়ার নিয়ে ম্যাজেস্টো ফার্নিচার Logo প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের নিয়ে ডিসেম্বরে বসবে আন্তর্জাতিক সম্মেলন Logo রাজউকে ভূমিদস্যুতার মামলায় দন্ডিত হাসেমপুত্র রাসেল কারাগারে  Logo সৌর প্রযুক্তির প্রসারে সোলার এক্সপো শুরু হচ্ছে ৩ নভেম্বর Logo আইসিসিবিতে শুরু হচ্ছে ৩ দিনব্যাপী বারভিডা আয়োজিত কার এক্সপো Logo জমে উঠেছে রাজধানীর বসুন্ধরায় দেশীয় ব্র্যান্ডের ফার্নিচার মেলা Logo আইসিসিবি ফার্নিচার মেলায় রিজিয়নাল ব্র্যান্ড, আয়োতো ফার্নিচার

রক অ্যান্ড পপ গুরু আজম খান জীবন, সংগ্রাম, সংগীত ও ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের উত্তরাধিকার

  • TV Today HD Desk:
  • আপডেট : ০৩:২০:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
  • ১৭৬ Time View

রক অ্যান্ড পপ গুরু আজম খান

জীবন, সংগ্রাম, সংগীত ও ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে যে কয়েকজন শিল্পীর নাম চিরকাল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছেন রক অ্যান্ড পপ গুরু আজম খান। তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতীক, স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশের তরুণ সমাজের কণ্ঠস্বর এবং বাংলা ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম প্রধান স্থপতি।

                                                                                                                 

পপ গুরু আজম খান

১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন আজম খান। কৈশোর থেকেই খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং সংগীতচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অস্ত্র হাতে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ২ নম্বর সেক্টরের একজন সম্মুখসমরের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

 স্বাধীনতার পর যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসে তিনি হাতে তুলে নেন গিটার। নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নতুন ভাষা, নতুন সুর এবং নতুন সাংস্কৃতিক চেতনার সূচনা করেন তিনি। সত্তরের দশকের শুরুতে ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’-তে গান পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁর সংগীতযাত্রা শুরু হয়।

 পরবর্তীতে তিনি গঠন করেন কিংবদন্তি ব্যান্ড উচ্চারণ, যা বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে।

 যে সময়ে ব্যান্ড সংগীতকে অনেকেই ‘অপসংস্কৃতি’ বলে আখ্যায়িত করতেন, সেই সময় আজম খান এবং উচ্চারণ সাহসিকতার সঙ্গে বাংলা ভাষায় রক, পপ এবং ফোক উপাদানের সমন্বয়ে নতুন ধারার সংগীত পরিবেশন করেন। তাঁদের পরিবেশনা শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি, বরং বাংলা ব্যান্ড সংগীতকে জাতীয় সংস্কৃতির মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

 উচ্চারণ এবং আজম খানের জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে— হৃদয় সাগর মরুভূমি, বাংলাদেশ, মা গো মা, সালেকা মালেকা, আলাল ও দুলাল, প্রেম চিরদিন দূরে দূরে, অভিমানী, পাপড়ি, জীবন সাথী, চুপ চুপ চুপ, হায় আল্লাহ, আসি আসি, জীবনে কিছু পাবো না প্রভৃতি। এই গানগুলোর অনেকগুলোই আজ বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে জনপ্রিয়।

বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে আজম খানের অবদান ছিল অসামান্য। তিনি এমন এক সময়ে ব্যান্ড সংগীতকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন, যখন এ ধারার সংগীতকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাঁর সাহসী পদক্ষেপ, ভিন্নধর্মী সংগীতচিন্তা এবং সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলা গানগুলো তরুণ সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর হাত ধরেই পরবর্তী সময়ে দেশের অসংখ্য ব্যান্ড গড়ে ওঠে এবং বাংলা ব্যান্ড সংগীত আজকের মর্যাদায় পৌঁছায়।

 সংগীতজীবনে তিনি দেশ–বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কিংবদন্তি ব্যান্ড Souls-এর ২০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে Channel i Music Awards-এ তাঁকে Lifetime Achievement Award-এ ভূষিত করা হয়।

 বাংলাদেশ সরকার তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরণোত্তর একুশে পদক (২০১৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০২৫) প্রদান করে দেশের সর্বোচ্চ দুই রাষ্ট্রীয় সম্মান— প্রদান করে।

 তবে আজম খান নিজে পুরস্কার ও সম্মাননার চেয়ে মানুষের ভালোবাসাকেই বেশি মূল্য দিতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন—

“আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার আমার গানের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।”

 দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু কেবল শারীরিক প্রস্থান; তাঁর গান, দর্শন, সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন আজও বেঁচে আছে লাখো মানুষের হৃদয়ে।

 ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের বিভিন্ন সময়ের লাইন–আপ

 ১৯৭২ সালে উচ্চারণের প্রথম লাইন–আপে লিড ভোকালে ছিলেন আজম খান, লিড গিটারে ইশতিয়াক রহমান, বেজ গিটারে ল্যারি, রিদম গিটারে নীলু, ড্রামসে ইদু, কঙ্গায় হাবলু এবং সাইড ভোকালে ছিলেন বাবু। স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের প্রথম দিককার পরীক্ষামূলক ও সাহসী যাত্রাগুলোর অন্যতম ছিল এই লাইন–আপ।

 ১৯৭৬ সালে উচ্চারণ পুনর্গঠিত হলে আজম খানের সঙ্গে যুক্ত হন লিড গিটারিস্ট নয়ন হক মুন্সী, রিদম গিটার ও সাইড ভোকালে দুলাল জোহা, বেজ গিটারে ফুয়াদ নাসের, কঙ্গায় কাজল এবং ড্রামসে পেয়ারু খান। এই লাইন–আপের সময়েই ‘আলাল ও দুলাল’-এর মতো গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং উচ্চারণ দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ডে পরিণত হয়।

 আশির দশকে উচ্চারণের সংগীতায়োজনে নতুন মাত্রা যোগ করেন রকেট। এ সময় আজম খানের সঙ্গে লিড গিটারে রকেট, বেজ গিটারে মাসুম হায়দার, রিদম গিটার ও সাইড ভোকালে দুলাল জোহা এবং ড্রামসে বাবু নিয়মিত পারফর্ম করতেন। ‘অভিমানী’, ‘জীবন সাথী’ এবং ‘পাপড়ি’র মতো জনপ্রিয় গান এই সময়ে ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা অর্জন করে।

 নব্বইয়ের দশক থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আজম খানের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে প্রায় অর্ধশতাধিক সংগীতশিল্পী কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রেবেল (ভোকাল), ইফরান (লিড গিটার), জুবরান (বেজ গিটার), তপু (ড্রামস) এবং আরও অনেক প্রতিভাবান সংগীতশিল্পী, যারা বিভিন্ন সময়ে উচ্চারণের মঞ্চ ও রেকর্ডিং কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।

 ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের পুনর্গঠন ও বর্তমান কার্যক্রম

আজম খানের পরিবারের প্রত্যক্ষ সমর্থনে এবং তাঁর সৃজনকর্মের কপিরাইট ও রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান Cool Exposure-এর উদ্যোগে, Channel i ও Impress Telefilm-এর সহযোগিতায় কিংবদন্তি ব্যান্ড উচ্চারণ নতুনভাবে পুনর্গঠিত হয়ে আবারও নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করেছে।

 

                                                                         

বর্তমানে ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের লাইন–আপে রয়েছেন– প্রেম (সাইড ভোকাল ও কিবোর্ড), পার্থ মজুমদার (লিড গিটার), দুলাল জোহা (ভোকাল ও রিদম গিটার), সেকান্দার আহমেদ খোকা (বেজ গিটার), পেয়ারু খান (ভোকাল ও পারকাশন), এবং বাপ্পি (ড্রামস)।

 ইতোমধ্যে ‘উচ্চারণ’ অংশগ্রহণ করেছে TMSS–Channel i Music Awards, Channel i Music Fest, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রবীন্দ্র সরোবরে অনুষ্ঠিত কনসার্ট, বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং দেশের নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে। তাদের পরিবেশনা দেশ–বিদেশের অসংখ্য দর্শক–শ্রোতার প্রশংসা অর্জন করেছে।

 Channel i ও Impress Telefilm-এর সহযোগিতায় উচ্চারণ ব্যান্ডের পুনরাগমন শুধু একটি ব্যান্ডের প্রত্যাবর্তন নয়; বরং এটি বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাস, রক অ্যান্ড পপ গুরু আজম খানের উত্তরাধিকার এবং তাঁর সৃষ্ট সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি সুসংগঠিত উদ্যোগ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

আজ ও গাজীপুরে দুইশতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা

রক অ্যান্ড পপ গুরু আজম খান জীবন, সংগ্রাম, সংগীত ও ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের উত্তরাধিকার

আপডেট : ০৩:২০:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

রক অ্যান্ড পপ গুরু আজম খান

জীবন, সংগ্রাম, সংগীত ও ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে যে কয়েকজন শিল্পীর নাম চিরকাল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছেন রক অ্যান্ড পপ গুরু আজম খান। তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতীক, স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশের তরুণ সমাজের কণ্ঠস্বর এবং বাংলা ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম প্রধান স্থপতি।

                                                                                                                 

পপ গুরু আজম খান

১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন আজম খান। কৈশোর থেকেই খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং সংগীতচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অস্ত্র হাতে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ২ নম্বর সেক্টরের একজন সম্মুখসমরের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

 স্বাধীনতার পর যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসে তিনি হাতে তুলে নেন গিটার। নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নতুন ভাষা, নতুন সুর এবং নতুন সাংস্কৃতিক চেতনার সূচনা করেন তিনি। সত্তরের দশকের শুরুতে ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’-তে গান পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁর সংগীতযাত্রা শুরু হয়।

 পরবর্তীতে তিনি গঠন করেন কিংবদন্তি ব্যান্ড উচ্চারণ, যা বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে।

 যে সময়ে ব্যান্ড সংগীতকে অনেকেই ‘অপসংস্কৃতি’ বলে আখ্যায়িত করতেন, সেই সময় আজম খান এবং উচ্চারণ সাহসিকতার সঙ্গে বাংলা ভাষায় রক, পপ এবং ফোক উপাদানের সমন্বয়ে নতুন ধারার সংগীত পরিবেশন করেন। তাঁদের পরিবেশনা শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি, বরং বাংলা ব্যান্ড সংগীতকে জাতীয় সংস্কৃতির মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

 উচ্চারণ এবং আজম খানের জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে— হৃদয় সাগর মরুভূমি, বাংলাদেশ, মা গো মা, সালেকা মালেকা, আলাল ও দুলাল, প্রেম চিরদিন দূরে দূরে, অভিমানী, পাপড়ি, জীবন সাথী, চুপ চুপ চুপ, হায় আল্লাহ, আসি আসি, জীবনে কিছু পাবো না প্রভৃতি। এই গানগুলোর অনেকগুলোই আজ বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে জনপ্রিয়।

বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে আজম খানের অবদান ছিল অসামান্য। তিনি এমন এক সময়ে ব্যান্ড সংগীতকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন, যখন এ ধারার সংগীতকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাঁর সাহসী পদক্ষেপ, ভিন্নধর্মী সংগীতচিন্তা এবং সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলা গানগুলো তরুণ সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর হাত ধরেই পরবর্তী সময়ে দেশের অসংখ্য ব্যান্ড গড়ে ওঠে এবং বাংলা ব্যান্ড সংগীত আজকের মর্যাদায় পৌঁছায়।

 সংগীতজীবনে তিনি দেশ–বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কিংবদন্তি ব্যান্ড Souls-এর ২০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে Channel i Music Awards-এ তাঁকে Lifetime Achievement Award-এ ভূষিত করা হয়।

 বাংলাদেশ সরকার তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরণোত্তর একুশে পদক (২০১৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০২৫) প্রদান করে দেশের সর্বোচ্চ দুই রাষ্ট্রীয় সম্মান— প্রদান করে।

 তবে আজম খান নিজে পুরস্কার ও সম্মাননার চেয়ে মানুষের ভালোবাসাকেই বেশি মূল্য দিতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন—

“আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার আমার গানের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।”

 দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু কেবল শারীরিক প্রস্থান; তাঁর গান, দর্শন, সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন আজও বেঁচে আছে লাখো মানুষের হৃদয়ে।

 ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের বিভিন্ন সময়ের লাইন–আপ

 ১৯৭২ সালে উচ্চারণের প্রথম লাইন–আপে লিড ভোকালে ছিলেন আজম খান, লিড গিটারে ইশতিয়াক রহমান, বেজ গিটারে ল্যারি, রিদম গিটারে নীলু, ড্রামসে ইদু, কঙ্গায় হাবলু এবং সাইড ভোকালে ছিলেন বাবু। স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের প্রথম দিককার পরীক্ষামূলক ও সাহসী যাত্রাগুলোর অন্যতম ছিল এই লাইন–আপ।

 ১৯৭৬ সালে উচ্চারণ পুনর্গঠিত হলে আজম খানের সঙ্গে যুক্ত হন লিড গিটারিস্ট নয়ন হক মুন্সী, রিদম গিটার ও সাইড ভোকালে দুলাল জোহা, বেজ গিটারে ফুয়াদ নাসের, কঙ্গায় কাজল এবং ড্রামসে পেয়ারু খান। এই লাইন–আপের সময়েই ‘আলাল ও দুলাল’-এর মতো গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং উচ্চারণ দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ডে পরিণত হয়।

 আশির দশকে উচ্চারণের সংগীতায়োজনে নতুন মাত্রা যোগ করেন রকেট। এ সময় আজম খানের সঙ্গে লিড গিটারে রকেট, বেজ গিটারে মাসুম হায়দার, রিদম গিটার ও সাইড ভোকালে দুলাল জোহা এবং ড্রামসে বাবু নিয়মিত পারফর্ম করতেন। ‘অভিমানী’, ‘জীবন সাথী’ এবং ‘পাপড়ি’র মতো জনপ্রিয় গান এই সময়ে ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা অর্জন করে।

 নব্বইয়ের দশক থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আজম খানের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে প্রায় অর্ধশতাধিক সংগীতশিল্পী কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রেবেল (ভোকাল), ইফরান (লিড গিটার), জুবরান (বেজ গিটার), তপু (ড্রামস) এবং আরও অনেক প্রতিভাবান সংগীতশিল্পী, যারা বিভিন্ন সময়ে উচ্চারণের মঞ্চ ও রেকর্ডিং কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।

 ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের পুনর্গঠন ও বর্তমান কার্যক্রম

আজম খানের পরিবারের প্রত্যক্ষ সমর্থনে এবং তাঁর সৃজনকর্মের কপিরাইট ও রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান Cool Exposure-এর উদ্যোগে, Channel i ও Impress Telefilm-এর সহযোগিতায় কিংবদন্তি ব্যান্ড উচ্চারণ নতুনভাবে পুনর্গঠিত হয়ে আবারও নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করেছে।

 

                                                                         

বর্তমানে ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের লাইন–আপে রয়েছেন– প্রেম (সাইড ভোকাল ও কিবোর্ড), পার্থ মজুমদার (লিড গিটার), দুলাল জোহা (ভোকাল ও রিদম গিটার), সেকান্দার আহমেদ খোকা (বেজ গিটার), পেয়ারু খান (ভোকাল ও পারকাশন), এবং বাপ্পি (ড্রামস)।

 ইতোমধ্যে ‘উচ্চারণ’ অংশগ্রহণ করেছে TMSS–Channel i Music Awards, Channel i Music Fest, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রবীন্দ্র সরোবরে অনুষ্ঠিত কনসার্ট, বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং দেশের নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে। তাদের পরিবেশনা দেশ–বিদেশের অসংখ্য দর্শক–শ্রোতার প্রশংসা অর্জন করেছে।

 Channel i ও Impress Telefilm-এর সহযোগিতায় উচ্চারণ ব্যান্ডের পুনরাগমন শুধু একটি ব্যান্ডের প্রত্যাবর্তন নয়; বরং এটি বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাস, রক অ্যান্ড পপ গুরু আজম খানের উত্তরাধিকার এবং তাঁর সৃষ্ট সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি সুসংগঠিত উদ্যোগ।