
বেদেপল্লির উন্নয়নে ৪০ পরিবার পেল খাস জমি, সেলাই মেশিন ও অর্থ
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঝড়-ঝঞ্ছা বৃষ্টি ভিজে, কখনো রাস্তার পাড় ধরে রোদে পুড়ে, কখনো নৌকায়, কখনো উত্তাল তরঙ্গে খাল বেয়ে এক জেলা হতে অন্য জেলায় ঘন-বসতিপূর্ণ হাট বাজারের কোল ঘেসে বেদে বহরের নোঙ্গর; আবার কখনো বা অন্যের জায়গায় কুড়ে-ঘড় তুলে কেটেছে জীবন। সে জীবন দোয়েলের কোকিলের চাতক পাখির ন্যায় বৈচিত্র্যপূর্ণ ও নয়, ছিল নিপীড়ন লাঞ্ছনায় ভরা যাযাবর জীবন। নেই নিজস্ব এক চিলতে জমি, নেই স্থায়ী ঠিকানাও এযেন কেবলই বয়ে বেড়ানো ক্যাঙ্গারু জীবনের এক অসমাপ্ত প্রত্যাবর্তন, যে গল্পের শুরু আছে শেষ নেই। অবশেষে প্রায় ৩০ বছরের অনিশ্চিত যাযাবর জীবনের অবসান হতে যাচ্ছে ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের রূপনগর বেদে পল্লির বাসিন্দাদের।
ঢাকার ধামরাই উপজেলার সুবিধাবঞ্চিত ৪০টি বেদে পরিবারকে খাস জমি দিল জেলা প্রশাসন। এছাড়া বেদে সম্প্রদায়ের ২৫ জনকে সেলাই মেশিন এবং সড়ক নির্মাণের জন্য ৫ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ধামরাই উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের রূপনগর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে এসব সহায়তা হস্তান্তর করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিজ ফরিদা খানম।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত বেদে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যেই এসব সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে জেলার অন্যান্য উপজেলার বেদে সম্প্রদায়ের পরিবারগুলোকেও সহযোগিতার আওতায় আনা হবে।”
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, “একটি সেলাই মেশিনের মাধ্যমে একটি পরিবারের অন্তত পাঁচজন সদস্যের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। “সেলাই মেশিনের পাশাপাশি বেদেপল্লির বাসিন্দাদের বাড়ির আঙিনার ফাঁকা জায়গায় ফলমূল ও সবজি চাষ এবং হাঁস-মুরগি পালনের প্রতিও উৎসাহিত করা হচ্ছে।”
মিজ ফরিদা খানমের এই উদ্যোগে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন বেদে পল্লির সদস্যরা। তারা জানান, জেলা প্রশাসকের দেওয়া খাস জমি, সেলাই মেশিন ও আর্থিক সহায়তা তাদের জীবনযাত্রায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। ভবিষ্যতে ও এ ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার দাবি জানান বেদে পল্লির বাসিন্দারা।
বেদে জীবনে জীবিকার প্রয়োজনে এক সময় নৌকাই ছিল তাদের ঘর-বাড়ি, বসবাসের একমাত্র অবলম্বন। পরে পানি থেকে স্থলে বসতি গড়লেও অন্যের জায়গায় থাকার কারণে সবসময়ই ছিল ভীতিকর এক অনিশ্চিত উচ্ছেদের জীবন।
মানবেতর জীবনের এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বেদেপল্লির বাসিন্দাদের স্থায়ী আবাসনের জন্য সরকারের খাস জমি তাদেরকে বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের নারীদের কর্মক্ষম রাখতে উপার্জনের জন্য ২৫ জনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সেলাই মেশিন।
‘হ্যালো ডিসি’ জেলা প্রশাসনের কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বনির্ভরতার লক্ষে সেলাই মেশিনের জন্য আবেদন করেছিলেন পল্লির নারীরা। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে পল্লির নারীদের এ সহায়তা দেওয়া হয়। সম্পৃক্তরা বলছেন, সেলাই মেশিনের মাধ্যমে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে এতে করে পরিবার গুলোতে সচ্ছলতা ফিরে আসার পথ তৈরি হয়েছে।
পল্লির বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে উপজেলা পরিষদের বিশেষ তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে আরও ৫ লাখ টাকা। আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ অর্থের চেক হস্তান্তর করা হয়।
জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা খানম বলেন, বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ ও এই সমাজেরই অংশ। ‘পিছিয়ে পড়া কোনো জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রাখা যাবে না। তাদের স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে আমরা কাজ করছি’।
তিনি বলেন, ’মানুষকে শুধু সহায়তা দেওয়া নয়, এমন সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন বদলাতে পারেন। আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেদে পল্লির নারীরা স্বাবলম্বী হবেন এবং পরিবারগুলো আর্থিকভাবে শক্তিশালী হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা’।
সম্প্রতি রূপনগর বেদেপল্লি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক। প্রায় ৩০ বছর পরে কোনো জেলা প্রশাসকের সরেজমিনে পল্লিটি পরিদর্শনের ঘটনা ছিল এটি। পরিদর্শনের সময় তিনি বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব, সন্তানদের জীবন যাপনের নানা সমস্যার কথা জানতে পারেন।
বেদেপল্লি পরিদর্শনকালে মিজ ফরিদা খানম পল্লির বাসিন্দাদের স্থায়ী আবাসন, আত্মকর্মসংস্থান ও সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই আশ্বাসের কার্যকারিতা শুরু হল খাস জমি বরাদ্ধ, নারীদের হাতে ২৫টি সেলাই মেশিন প্রদান এবং বেদেপল্লির উন্নয়নে ৫ লাখ টাকা প্রদানের মাধ্যমে।
–টিভি টুডে
TV Today HD Desk: 











