ঢাকা ০৪:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo আজ ও গাজীপুরে দুইশতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা Logo যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চার মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১১.৫১ শতাংশ Logo এক দিনেই সারাদেশে ৫২৯ পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা Logo আইসিসিবি ফার্নিচার মেলায় রিল্যাক্সজিন চেয়ার নিয়ে ম্যাজেস্টো ফার্নিচার Logo প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের নিয়ে ডিসেম্বরে বসবে আন্তর্জাতিক সম্মেলন Logo রাজউকে ভূমিদস্যুতার মামলায় দন্ডিত হাসেমপুত্র রাসেল কারাগারে  Logo সৌর প্রযুক্তির প্রসারে সোলার এক্সপো শুরু হচ্ছে ৩ নভেম্বর Logo আইসিসিবিতে শুরু হচ্ছে ৩ দিনব্যাপী বারভিডা আয়োজিত কার এক্সপো Logo জমে উঠেছে রাজধানীর বসুন্ধরায় দেশীয় ব্র্যান্ডের ফার্নিচার মেলা Logo আইসিসিবি ফার্নিচার মেলায় রিজিয়নাল ব্র্যান্ড, আয়োতো ফার্নিচার

পানি পানের বিজ্ঞান

  • TV Today HD Desk:
  • আপডেট : ০৭:২৪:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫১ Time View

পানি পানের বিজ্ঞান

কনক জ্যোতি,

পানি কীভাবে পান করলে শরীর সেটিকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে?

আমরা পানি পান করি প্রতিদিন, অসংখ্যবার। তৃষ্ণা পেলেই বোতল হাতে নেই, কয়েক ঢোকে পানি পান করি, তারপর আবার নিজের কাজে ফিরে যাই। এত স্বাভাবিক একটা কাজ নিয়ে খুব কম মানুষই ভাবেন- পানি কীভাবে পান করলে শরীর  সেটিকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে?

সম্প্রতি প্রকাশিত BBC Science Focus Magazine -এর প্রতিবেদনটি এই আপাত সাধারণ প্রশ্নটির উত্তর দিতে গিয়ে শরীরের জল নিয়ন্ত্রণের এক চমৎকার শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া তুলে ধরেছে।  প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো, একসঙ্গে অনেকটা পানি পান করার চেয়ে দিনজুড়ে অল্প অল্প করে পানি পান করা শরীরের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।

পানি শুধু তৃষ্ণা মেটায় না

পানি আমাদের শরীরের একটি মৌলিক উপাদান। এটি কেবল মুখের শুষ্কতা দূর করে বা তৃষ্ণা মেটায় না; শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পানি সরাসরি যুক্ত। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নিউরোট্রান্সমিটার উৎপাদন এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াতেও পানি প্রয়োজন। ফলে শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হলে তার প্রভাব মেজাজ ও মনোযোগের ওপরও পড়তে পারে। অর্থাৎ পানি পানকে শুধু দৈনন্দিন অভ্যাস হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়। পর্যাপ্ত পানি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।

তৃষ্ণা পেলেই একসঙ্গে অনেক পানি?

তৃষ্ণা পেলে অনেকেই দ্রুত এক গ্লাস বা বোতলভর্তি পানি একসঙ্গে পান করেন। এতে মুহূর্তের জন্য স্বস্তি পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা বলছে, শরীর একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পানি পেলে সেটিকে শুধু গ্রহণ করে বসে থাকে না; বরং শরীরের ভেতরের জল ও লবণের ভারসাম্য রক্ষায় নিজস্ব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদনে একটি হাসপাতালভিত্তিক গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে একই পরিমাণ পানি একবারে পান করা এবং অল্প অল্প করে পান করার পর শরীরের প্রস্রাব উৎপাদনের প্রতিক্রিয়া তুলনা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, একবারে বেশি পানি পান করলে শরীর দ্রুত বেশি প্রস্রাব তৈরি করতে শুরু করে। বিপরীতে একই পরিমাণ পানি ধীরে ধীরে পান করলে শরীর সেটির বেশি অংশ দীর্ঘসময় ধরে রাখতে পারে। এখানেই আসে সিপিং বা অল্প অল্প করে পানি পান করার যুক্তি।

শরীর আসলে পানির হিসাব রাখে

মানবদেহকে অনেকটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। শরীরের ভেতরে পানির পরিমাণ ইচ্ছামতো ওঠানামা করতে দেওয়া হয় না। রক্তে দ্রবীভূত বিভিন্ন পদার্থের ঘনত্ব বা osmolality শরীর নিবিড়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। পানিশূন্যতা হলে এই ঘনত্ব বেড়ে যায়; অতিরিক্ত পানি শরীরে গেলে তা কমে যায়।

এই পরিবর্তন শনাক্ত করার জন্য মস্তিষ্কে রয়েছে osmoreceptors। এগুলো রক্তের ঘনত্বের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে এবং শরীরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে antidiuretic hormone বা ADH। এই হরমোন শরীরের রক্তনালি ও কিডনির ওপর প্রভাব ফেলে এবং পানি ও লবণের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। যখন শরীরে পানির প্রয়োজন বেশি, তখন ADH-এর ভূমিকা বাড়ে; আর শরীরে পানি বেশি হয়ে গেলে এর নিঃসরণ কমে যায়, ফলে তুলনামূলকভাবে পাতলা প্রস্রাব তৈরি হয়।

অর্থাৎ, আমরা পানি পান করার পর শরীরের ভেতরে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম সমন্বয় শুরু হয়। পানি কোথায় যাবে, কতটা ধরে রাখা হবে এবং কতটা বের হয়ে যাবে—এসবের ওপর শরীর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

একসঙ্গে বেশি পানি কেন সবসময় ভালো নয়?

পানি শরীরের জন্য অপরিহার্য—কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে যত বেশি পানি, তত বেশি স্বাস্থ্য। শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় খুব দ্রুত অতিরিক্ত পানি গ্রহণ করলে বিরল ক্ষেত্রে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

প্রতিবেদনে water intoxication বা অতিরিক্ত পানি গ্রহণজনিত বিষক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। এর ফলে কোষগুলো ফুলে উঠতে পারে, এমনকি মস্তিষ্কের কোষও আক্রান্ত হতে পারে। প্রতিবেদনে এমন বিরল ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে এই অবস্থার কারণে মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

তবে এখানে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সাধারণ পরিস্থিতিতে একবার এক গ্লাস পানি পান করলেই এমন বিপদ তৈরি হয় না। প্রতিবেদনের বক্তব্যও তা নয়। বরং মূল শিক্ষা হলো—অতিরিক্ত পানি খুব দ্রুত পান করার প্রয়োজন নেই।

তাহলে সবচেয়ে ভালো অভ্যাস কী?

প্রতিবেদনটির সারকথা অত্যন্ত সহজ: তৃষ্ণা মেটানোর জন্য পানি পান করুন, কিন্তু একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পানি ঢেলে না খেয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে পান করা বেশি কার্যকর হতে পারে। এতে শরীর পানি ধরে রাখার সুযোগ পায় এবং অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের করে দেওয়ার প্রয়োজন কমে। এটি কোনো জটিল স্বাস্থ্য-রুটিন নয়। বরং শরীরের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সহজ অভ্যাস।

পানি পান নিয়ে আমাদের ভুল ধারণা কোথায়?

পানি নিয়ে স্বাস্থ্যচর্চায় একটি জনপ্রিয় ধারণা হলো—একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি প্রতিদিন অবশ্যই পান করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে পানির প্রয়োজন সবার ক্ষেত্রে এক নয়। দৈনন্দিন জীবনযাপন, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম এবং শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পানির চাহিদা পরিবর্তিত হতে পারে।

তাই পানি পানকে কোনো প্রতিযোগিতায় পরিণত করার প্রয়োজন নেই। শরীরের সংকেতের প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং নিয়মিতভাবে পানি গ্রহণ করাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘসময় বাইরে থাকা, শারীরিক পরিশ্রম বা অতিরিক্ত ঘামের মতো পরিস্থিতিতে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তখন পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে খুব অল্প সময়ে অতিরিক্ত পানি পান করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

পানির ক্ষেত্রেও ভারসাম্যই মূল কথা

পানি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত একটি শব্দে বলা যায়—ভারসাম্য। পানিশূন্যতা যেমন শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করতে পারে, তেমনি প্রয়োজনের তুলনায় দ্রুত অতিরিক্ত পানি গ্রহণও শরীরের স্বাভাবিক জল-লবণ ভারসাম্যকে ব্যাহত করতে পারে। মানবদেহ নিজেই এই ভারসাম্য রক্ষার জন্য অসাধারণ একটি ব্যবস্থা তৈরি করে রেখেছে—মস্তিষ্কের osmoreceptors থেকে শুরু করে ADH এবং কিডনির নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত।

তাই পানি পান কোনো যান্ত্রিক কাজ নয়; এর পেছনেও রয়েছে জটিল জীববিজ্ঞান। সবচেয়ে সহজ শিক্ষা হলো—তৃষ্ণাকে উপেক্ষা না করে, আবার একসঙ্গে অতিরিক্ত পানি পান না করে, দিনের বিভিন্ন সময়ে স্বাভাবিকভাবে পানি পান করা। এক ঢোকে বোতল শেষ করার চেয়ে ধীরে ধীরে পানি পান করাই অনেক সময় শরীরের স্বাভাবিক জল-নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অর্থাৎ, পানি পান করার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের পরামর্শ খুব সাধারণ: শরীরকে শুনুন, ভারসাম্য বজায় রাখুন এবং পানিকে শুধু তৃষ্ণা নিবারণের উপকরণ নয়—শরীরের সূক্ষ্ম জীবনপ্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখুন।

-টিভি টুডে

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

আজ ও গাজীপুরে দুইশতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা

পানি পানের বিজ্ঞান

আপডেট : ০৭:২৪:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

পানি পানের বিজ্ঞান

কনক জ্যোতি,

পানি কীভাবে পান করলে শরীর সেটিকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে?

আমরা পানি পান করি প্রতিদিন, অসংখ্যবার। তৃষ্ণা পেলেই বোতল হাতে নেই, কয়েক ঢোকে পানি পান করি, তারপর আবার নিজের কাজে ফিরে যাই। এত স্বাভাবিক একটা কাজ নিয়ে খুব কম মানুষই ভাবেন- পানি কীভাবে পান করলে শরীর  সেটিকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে?

সম্প্রতি প্রকাশিত BBC Science Focus Magazine -এর প্রতিবেদনটি এই আপাত সাধারণ প্রশ্নটির উত্তর দিতে গিয়ে শরীরের জল নিয়ন্ত্রণের এক চমৎকার শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া তুলে ধরেছে।  প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো, একসঙ্গে অনেকটা পানি পান করার চেয়ে দিনজুড়ে অল্প অল্প করে পানি পান করা শরীরের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।

পানি শুধু তৃষ্ণা মেটায় না

পানি আমাদের শরীরের একটি মৌলিক উপাদান। এটি কেবল মুখের শুষ্কতা দূর করে বা তৃষ্ণা মেটায় না; শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পানি সরাসরি যুক্ত। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নিউরোট্রান্সমিটার উৎপাদন এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াতেও পানি প্রয়োজন। ফলে শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হলে তার প্রভাব মেজাজ ও মনোযোগের ওপরও পড়তে পারে। অর্থাৎ পানি পানকে শুধু দৈনন্দিন অভ্যাস হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়। পর্যাপ্ত পানি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।

তৃষ্ণা পেলেই একসঙ্গে অনেক পানি?

তৃষ্ণা পেলে অনেকেই দ্রুত এক গ্লাস বা বোতলভর্তি পানি একসঙ্গে পান করেন। এতে মুহূর্তের জন্য স্বস্তি পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা বলছে, শরীর একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পানি পেলে সেটিকে শুধু গ্রহণ করে বসে থাকে না; বরং শরীরের ভেতরের জল ও লবণের ভারসাম্য রক্ষায় নিজস্ব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদনে একটি হাসপাতালভিত্তিক গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে একই পরিমাণ পানি একবারে পান করা এবং অল্প অল্প করে পান করার পর শরীরের প্রস্রাব উৎপাদনের প্রতিক্রিয়া তুলনা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, একবারে বেশি পানি পান করলে শরীর দ্রুত বেশি প্রস্রাব তৈরি করতে শুরু করে। বিপরীতে একই পরিমাণ পানি ধীরে ধীরে পান করলে শরীর সেটির বেশি অংশ দীর্ঘসময় ধরে রাখতে পারে। এখানেই আসে সিপিং বা অল্প অল্প করে পানি পান করার যুক্তি।

শরীর আসলে পানির হিসাব রাখে

মানবদেহকে অনেকটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। শরীরের ভেতরে পানির পরিমাণ ইচ্ছামতো ওঠানামা করতে দেওয়া হয় না। রক্তে দ্রবীভূত বিভিন্ন পদার্থের ঘনত্ব বা osmolality শরীর নিবিড়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। পানিশূন্যতা হলে এই ঘনত্ব বেড়ে যায়; অতিরিক্ত পানি শরীরে গেলে তা কমে যায়।

এই পরিবর্তন শনাক্ত করার জন্য মস্তিষ্কে রয়েছে osmoreceptors। এগুলো রক্তের ঘনত্বের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে এবং শরীরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে antidiuretic hormone বা ADH। এই হরমোন শরীরের রক্তনালি ও কিডনির ওপর প্রভাব ফেলে এবং পানি ও লবণের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। যখন শরীরে পানির প্রয়োজন বেশি, তখন ADH-এর ভূমিকা বাড়ে; আর শরীরে পানি বেশি হয়ে গেলে এর নিঃসরণ কমে যায়, ফলে তুলনামূলকভাবে পাতলা প্রস্রাব তৈরি হয়।

অর্থাৎ, আমরা পানি পান করার পর শরীরের ভেতরে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম সমন্বয় শুরু হয়। পানি কোথায় যাবে, কতটা ধরে রাখা হবে এবং কতটা বের হয়ে যাবে—এসবের ওপর শরীর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

একসঙ্গে বেশি পানি কেন সবসময় ভালো নয়?

পানি শরীরের জন্য অপরিহার্য—কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে যত বেশি পানি, তত বেশি স্বাস্থ্য। শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় খুব দ্রুত অতিরিক্ত পানি গ্রহণ করলে বিরল ক্ষেত্রে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

প্রতিবেদনে water intoxication বা অতিরিক্ত পানি গ্রহণজনিত বিষক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। এর ফলে কোষগুলো ফুলে উঠতে পারে, এমনকি মস্তিষ্কের কোষও আক্রান্ত হতে পারে। প্রতিবেদনে এমন বিরল ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে এই অবস্থার কারণে মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

তবে এখানে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সাধারণ পরিস্থিতিতে একবার এক গ্লাস পানি পান করলেই এমন বিপদ তৈরি হয় না। প্রতিবেদনের বক্তব্যও তা নয়। বরং মূল শিক্ষা হলো—অতিরিক্ত পানি খুব দ্রুত পান করার প্রয়োজন নেই।

তাহলে সবচেয়ে ভালো অভ্যাস কী?

প্রতিবেদনটির সারকথা অত্যন্ত সহজ: তৃষ্ণা মেটানোর জন্য পানি পান করুন, কিন্তু একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পানি ঢেলে না খেয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে পান করা বেশি কার্যকর হতে পারে। এতে শরীর পানি ধরে রাখার সুযোগ পায় এবং অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের করে দেওয়ার প্রয়োজন কমে। এটি কোনো জটিল স্বাস্থ্য-রুটিন নয়। বরং শরীরের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সহজ অভ্যাস।

পানি পান নিয়ে আমাদের ভুল ধারণা কোথায়?

পানি নিয়ে স্বাস্থ্যচর্চায় একটি জনপ্রিয় ধারণা হলো—একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি প্রতিদিন অবশ্যই পান করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে পানির প্রয়োজন সবার ক্ষেত্রে এক নয়। দৈনন্দিন জীবনযাপন, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম এবং শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পানির চাহিদা পরিবর্তিত হতে পারে।

তাই পানি পানকে কোনো প্রতিযোগিতায় পরিণত করার প্রয়োজন নেই। শরীরের সংকেতের প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং নিয়মিতভাবে পানি গ্রহণ করাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘসময় বাইরে থাকা, শারীরিক পরিশ্রম বা অতিরিক্ত ঘামের মতো পরিস্থিতিতে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তখন পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে খুব অল্প সময়ে অতিরিক্ত পানি পান করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

পানির ক্ষেত্রেও ভারসাম্যই মূল কথা

পানি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত একটি শব্দে বলা যায়—ভারসাম্য। পানিশূন্যতা যেমন শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করতে পারে, তেমনি প্রয়োজনের তুলনায় দ্রুত অতিরিক্ত পানি গ্রহণও শরীরের স্বাভাবিক জল-লবণ ভারসাম্যকে ব্যাহত করতে পারে। মানবদেহ নিজেই এই ভারসাম্য রক্ষার জন্য অসাধারণ একটি ব্যবস্থা তৈরি করে রেখেছে—মস্তিষ্কের osmoreceptors থেকে শুরু করে ADH এবং কিডনির নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত।

তাই পানি পান কোনো যান্ত্রিক কাজ নয়; এর পেছনেও রয়েছে জটিল জীববিজ্ঞান। সবচেয়ে সহজ শিক্ষা হলো—তৃষ্ণাকে উপেক্ষা না করে, আবার একসঙ্গে অতিরিক্ত পানি পান না করে, দিনের বিভিন্ন সময়ে স্বাভাবিকভাবে পানি পান করা। এক ঢোকে বোতল শেষ করার চেয়ে ধীরে ধীরে পানি পান করাই অনেক সময় শরীরের স্বাভাবিক জল-নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অর্থাৎ, পানি পান করার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের পরামর্শ খুব সাধারণ: শরীরকে শুনুন, ভারসাম্য বজায় রাখুন এবং পানিকে শুধু তৃষ্ণা নিবারণের উপকরণ নয়—শরীরের সূক্ষ্ম জীবনপ্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখুন।

-টিভি টুডে