
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিজিএমইএ পরিচালনা পর্ষদের সৌজন্য সাক্ষাৎ
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বঙ্গভবনে সৌজন্য সাক্ষাতে করেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এর সভাপতি জনাব মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে বিজিএমইএ পরিচালনা পর্ষদের একটি প্রতিনিধিদল।
সাক্ষাতকালে জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের সংকট ও নীতিগত সুপারিশ, সার্বিক পরিস্থিতি, উদীয়মান চ্যালেঞ্জসমূহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ়করণসহ দেশীয় শিল্প সুরক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সহ-সভাপতি জনাব ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি জনাব মোঃ রেজোয়ান সেলিম, সহ-সভাপতি (অর্থ) জনাব মিজানুর রহমান, সহ-সভাপতি মিজ ভিদিয়া অমৃত খান, সহ-সভাপতি জনাব মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, সহ-সভাপতি জনাব মোহাম্মদ রফিক চৌধুরী এবং পরিচালকবৃন্দ।
বিজিএমইএ সভাপতি দেশীয় শিল্প ও ব্যবসার প্রসারে বর্তমান সরকারের নানামুখী দূরদর্শী ও শিল্পবান্ধব পদক্ষেপের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিতকরণ, নিষ্ক্রিয় ও বন্ধ পোশাক কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা প্রদান, নন-বন্ড কারখানার জন্য বন্ডেড কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরাসরি রপ্তানির পথ সুগম করা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণের মতো সিদ্ধান্তগুলো শিল্প উদ্যোক্তাদের বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে – যা ইজ অব ডুয়িং বিজনেস নিশ্চিতকরণে বর্তমান সরকারের দূরদর্শিতার ও আন্তরিকতারই বহিঃপ্রকাশ বলে বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ অভিমত প্রকাশ করেন।
সাক্ষাৎকালে বিজিএমইএ সভাপতি তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান কঠিন বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মুখে তুলে ধরেন-
তীব্র জ্বালানি সংকট: পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের অভাবে সিংহভাগ কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদনে বাধ্য হচ্ছে, যা রপ্তানি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছ।
অস্বাভাবিক উৎপাদন ব্যয়: জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার ও মজুরি সমন্বয়ে গত ৩ বছরে উৎপাদন খরচ প্রায় ৪০% বেড়েছে।
রপ্তানি ও বিনিয়োগে মন্দা: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি ১.৬৪% এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে ১.৯২% হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমায় নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে।
কারখানা বন্ধ: উচ্চ ব্যয় ও অর্ডার সংকটের মুখোমুখি হয়ে গত ৩ বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যা কর্মসংস্থানের জন্য চরম উদ্বেগজনক।
বিদ্যমান এ সংকট উত্তরণ ও তৈরি পোশাক খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বৈঠকে বিজিএমইএ এর পক্ষ থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিগত সুপারিশ পেশ করা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
ক) জ্বালানি নিরাপত্তা: দ্রুততম সময়ে অতিরিক্ত ২টি FSRU স্থাপন করা – গ্যাসের তীব্র সংকট নিরসনে দ্রুততম সময়ে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল যুক্ত করে আমদানিকৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো; দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখা ও আমদানি পর্যায়ে সকল শুল্ক-কর প্রত্যাহার করা; ক্ষুদ্র ও মাঝারি (১৫০-৫০০ কেজি বয়লার বিশিষ্ট) কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত গ্যাস সংযোগ প্রদান এবং পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদে স্বল্প সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রদান।
খ) অবকাঠামোগত দক্ষতা ও লজিস্টিকস উন্নয়ন: অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করা; হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে বর্ধিত কার্গো শেড নির্মাণ করা এবং বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে চালু করা।
গ) ব্যাংকিং, অর্থায়ন ও তারল্য সহায়তা: চলতি মূলধন ও বাণিজ্য ঋণের সুদের হার হ্রাস করা; পোশাক খাতের জন্য বিশেষায়িত ‘পোস্ট-শিপমেন্ট ফাইন্যান্সিং স্কিম’ প্রণয়ন করা এবং GTF ও TDF তহবিলে অর্থ বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা।
ঘ) ইজ অব ডুইং বিজনেস: কাস্টমস বন্ড অডিট প্রক্রিয়া জটিলতামুক্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং পোশাক শিল্পের কাঁচামাল দ্রুত সরবরাহের স্বার্থে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করা।
ঙ) উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য নিরাপত্তা: এলডিসি উত্তরণের পরও শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা অব্যাহত রাখতে ইইউ এর সাথে দ্রুততম সময়ে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে কূটনৈতিক প্রয়াস জোরদার করা এবং প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশ ও অঞ্চলগুলোর সাথে এফটিএ, পিটিএ এবং ইপিএ সম্পাদনে দ্রুত ও কৌশলগত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা।
চ) শ্রমিক কল্যাণ ও নীতিগত সহায়তা: গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও কল্যাণে আধুনিক হাসপাতাল ও কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য দ্রুত জমি বরাদ্দ দান এবং ঝুট ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা।
রাষ্ট্রপতি বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে শোনেন এবং তৈরি পোশাক শিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, সাময়িক এ প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ অবস্থান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতা প্রদানের বিষয়ে তিনি বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলটিকে আশ্বস্ত করেন।
–টিভি টুডে
TV Today HD Desk: 















