
‘নামটা জানা আছে কী যেন, এই যাহ্ মুখে আসছে না’! ভুলে যাওয়ার এই অভ্যাস কখন চিন্তার?
আমরা চলার পথে হঠাৎ দেখা হলো চেনা জানা কারো সঙ্গে কথা হলো কুশল বিনিময়ও কিন্তু নাম মনে পড়ছে না, আবার কথা বলতে আলোচনার টেবিলে বা বন্ধু আড্ডায় মাঝেমধ্যে কোনও পরিচিত শব্দ মনে না পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো- ঘটনাটি কি বারবার হচ্ছে বা ক্রমাগত বাড়ছে এবং তার সঙ্গে অন্য কোন পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে ‘বয়স হয়েছে’ বলে এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
জানাশোনা বা পরিচিত মানুষটির অবয়ব মনে আছে। সাজিয়ে রেখেছেন, ঠিক কী বলতে চান। অথচ মুখে আনতে গেলেই শব্দটা যেন কোথায় হারিয়ে গেল! কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট পর আবার আচমকাই মনে পড়ে গেল। এমন অভিজ্ঞতা কমবেশি সকলেরই হয়, হয়তো। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘টিপ-অফ-দ্য-টাং’ মুহূর্ত। মাঝে মধ্যে হলে সাধারণত তা নিয়ে চিন্তা ভাবনার কিছু নেই। কিন্তু বারবার এমন হতে থাকলে বা সমস্যা ধীরে ধীরে বাড়লে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়।
মস্তিস্কে এই সময় কী হয়?
নিউরোলজিস্টদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে শব্দটি মস্তিষ্ক থেকে মুছে যায় না। আসলে সেই মুহূর্তে স্মৃতিতে থাকা শব্দটি খুঁজে বের করতে সাময়িক সমস্যা হয়। তাই শব্দটি মনে করার চেষ্টা করেও বলা যায় না। অনেক সময় শব্দটির প্রথম অক্ষর, অর্থ বা তার সঙ্গে জড়িত কোনও তথ্য মনে থাকে। কিছুক্ষণ পর কোনও চেষ্টা ছাড়াই শব্দটি আবার মনে পড়ে যায়।
কোনও শব্দ মুখে আনতে মস্তিষ্কের ভাষা ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক অংশকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। সেই প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে ধীর হয়ে গেলেই পরিচিত শব্দটিও অধরা মনে হতে পারে।
ঘুম কম? চাপবেশি? সমস্যা বাড়তে পারে-
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপ, উদ্বেগ বা মানসিক ক্লান্তি মস্তিষ্কের তথ্য খুঁজে বের করার ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে ধীর করে দিতে পারে। তাই ব্যস্ত বা মানসিকভাবে চাপে থাকার সময়ে এমন ঘটনা একটু বেশি ঘটতেই পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গেও মস্তিষ্কের তথ্য উদ্ধারের গতি কিছুটা কমে। ফলে বয়স্কদের কোনও নাম বা শব্দ মনে করতে একটু বেশি সময় লাগতে পারে। শুধু এই কারণে তাকে স্মৃতিভ্রংশের লক্ষণ বলা যায় না।
তবে কখন চিন্তার?
সমস্যাটি কত ঘন ঘন হচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে বাড়ছে কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। পরিচিত নাম বা সাধারণ শব্দ বারবার মনে না পড়া, কথার মধ্যে বারবার থেমে যাওয়া বা নিজের বক্তব্য ঠিকমতো প্রকাশ করতে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
শুধু স্নায়ুর সমস্যা নয়, ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, অবসাদ, উদ্বেগ বা শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার কারণেও এমন সমস্যা হতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপও দীর্ঘদিন ধরে চললে মস্তিষ্কের কাজের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সঙ্গে এই লক্ষণ থাকলে অবহেলা নয়
শব্দ খুঁজে পাওয়ার সমস্যার পাশাপাশি যদি পরিচিত জিনিসের নাম বারবার ভুলে যাওয়া, কথোপকথন বুঝতে বা চালিয়ে যেতে সমস্যা, আচরণে পরিবর্তন, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা দৈনন্দিন কাজ করতে অসুবিধা দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পরিচিত জায়গায় গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলা বা হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে পড়াও সতর্ক হওয়ার লক্ষণ। আর একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। হঠাৎ কথা বলতে বা শব্দ উচ্চারণ করতে সমস্যা হওয়ার সঙ্গে মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, হাত-পায়ে দুর্বলতা বা অসাড়তা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা বিভ্রান্তি দেখা দিলে তা স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে এক মুহূর্তও দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
শব্দ আটকে গেলে কী করবেন?
কোনও শব্দ মনে না পড়লে বারবার জোর করে সেটি মনে করার চেষ্টা না করাই ভালো। বরং কিছুক্ষণ থেমে গিয়ে অন্যভাবে কথাটি বোঝানোর চেষ্টা করুন। শব্দটির অর্থ, ব্যবহার বা কোনও বৈশিষ্ট্য দিয়ে বলতে পারেন। অনেক সময় কিছুক্ষণ পর শব্দটি নিজে থেকেই মনে পড়ে যায়।
পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য উপকারী। নতুন কিছু শেখার অভ্যাসও জ্ঞানীয় ক্ষমতা সক্রিয় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
মাঝেমধ্যে কোনও পরিচিত শব্দ মনে না পড়া স্বাভাবিক। আসল চিন্তার বিষয় হল—ঘটনাটি কি বারবার হচ্ছে বা ক্রমাগত বাড়ছে এবং তার সঙ্গে অন্য কোনও পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে ‘বয়স হয়েছে’ বলে এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
–টিভি টুডে
TV Today HD Desk: 












