পারমানবিক অস্ত্র নয় সম্পদ লুটতে যুদ্ধ: মার্কিনিদের উদ্দেশ্যে আইআরজিসির চিঠি
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের উদ্দশ্যে সরাসরি কয়েক ডজন পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ চিঠি প্রকাশ করেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আইআরজিসির মুখপাত্র ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি এই চিঠির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।
এবার মার্কিন জনগণের উদ্দেশে সরাসরি দীর্ঘ একটি চিঠি প্রকাশ করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কয়েক ডজন পৃষ্ঠার ওই চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ড, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির বিষয়ে আমেরিকান জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
ইরানের আইআরজিসির ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চিঠিটি মূলত মার্কিন জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একটি উদ্যোগ। এতে আমেরিকানদের নিজেদের চারপাশের পরিস্থিতি, মার্কিন সরকারের কর্মকাণ্ড এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জেনারেল মোহেবির দাবি, মার্কিন সামরিক বাহিনী যেসব ‘অপরাধ’ করছে বলে ইরান মনে করে, সেগুলো সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নাগরিকই অবগত নন।
মোহেবি বলেন, এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং ইরানের সঙ্গে দেশটির বিরোধের পেছনেও এর প্রভাব রয়েছে বলে আইআরজিসি মনে করে।
মার্কিন জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের আহ্বান:
আইআরজিসির পক্ষ থেকে মার্কিন জনগণের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি বলেন, “আমেরিকানরা আমাদের অঞ্চল সম্পর্কে জানেন না। তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য আমাদের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা প্রয়োজন। আমরা মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রস্তুত, তারাও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।”
তিনি বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং দুই দেশের মধ্যকার বিরোধ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা তৈরি হতে পারে।
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার:
মার্কিন জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেছেন আইআরজিসির মুখপাত্র।
মোহেবি বলেন, ইরান কখনওই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেনি এবং ভবিষ্যতেও সে পথে যাওয়ার কোনও অঙ্গীকার নেই।
তিনি বলেন, “ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করেনি এবং এ বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র বিরোধ রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তেহরান অবশ্য বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
কেন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত আইআরজিসি?
মোহেবি মার্কিন নাগরিকদের প্রতি তাদের সরকারের কাছে আইআরজিসিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার কারণ জানতে চাওয়ার আহ্বান জানান।
তার দাবি, ইরান ও এ অঞ্চলে ‘লুটপাট’ ঠেকানোর কারণেই আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও তোলেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী স্কুল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ ও গির্জায় বোমা হামলার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছে, অথচ এসব বিষয়ে অনেক মার্কিন নাগরিক অবগত নন।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে আইআরজিসির বক্তব্য ও দাবিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মার্কিন সরকার এসব অভিযোগের বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, তা এই বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।
বিশ্বজুড়ে ৮০০ মার্কিন ঘাঁটির প্রয়োজন নেই:
মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আইআরজিসির মুখপাত্র। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮০০ সামরিক ঘাঁটি থাকার কোনও প্রয়োজন নেই।
মোহেবির দাবি, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বার্ষিক বাজেট যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন। তার দাবি, মার্কিন শাসকেরা নিজেদের জনগণের কথা যথেষ্ট বিবেচনা করেন না এবং দেশটির প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।
মোহেবি প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তনের সময় এসেছে কি না। তার যুক্তি, মার্কিন সরকার সামরিক হামলায় যে অর্থ ব্যয় করে তার মাত্র ১০ শতাংশ যদি বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর সহায়তায় ব্যয় করত, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবে আরও জনপ্রিয় দেশ হয়ে উঠত।
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে লক্ষ্য করে ইরানের বার্তা:
আইআরজিসির এই দীর্ঘ বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের পাশাপাশি সরাসরি মার্কিন জনগণের কাছে ইরানের অবস্থান তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বক্তব্যে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি, সামরিক ঘাঁটি, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
একই সঙ্গে মার্কিন জনগণকে সরকারের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চিঠিটি কয়েক ডজন পৃষ্ঠার হওয়ায় এর সব বিষয় এখনও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা শেষ হয়নি। ফলে এতে থাকা অন্যান্য বক্তব্য ও দাবির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আরও সময় লাগবে।
তবে আইআরজিসির মুখপাত্রের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ইরান শুধু মার্কিন সরকারের সঙ্গে নয়, দেশটির সাধারণ জনগণের সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের বার্তা দিতে চাইছে। চলমান উত্তেজনার মধ্যে ওয়াশিংটনের নীতি নিয়ে মার্কিন জনমতকে আলোচনায় আনার চেষ্টাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা