ব্যাংকে তিনমাসে কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি
বাজার বিশ্লেষক আহমদ ইকবাল হাসান যা বলছেন-
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে অর্থনৈতিক সংকট, বহুমুখী সমস্যা, মূল্যস্ফীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় অব্যাহতের মধ্যেও ব্যাংক খাতে মাত্র তিন মাসে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ থাকার হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকগুলোতে এক কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি। মার্চ শেষে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি।
আওয়াজ আসছে, একদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যাংকে বড় অঙ্কের আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বাড়ছে। অর্থনীতির এই দুই বিপরীত চিত্রই এখন আলোচনা-সমালোচনায়।
এই বৈপরীত্য চিত্রে খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের একটি অংশ যেখানে দৈনন্দিন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বড় ব্যবসা ও বিত্তশালী শ্রেণির একটি অংশের আয় ও ব্যাংক আমানত বাড়ছে, তো কীভাবে বাড়ছে এসব কথা ঘুরেফিরে আসছে সামনে!
একই সময়ে ব্যক্তি শ্রেণির হিসাব বাড়লেও কমেছে আমানতের পরিমাণ। তবে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ্যযোগ্য হারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট হিসাবের (অ্যাকাউন্ট) সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টি। এর মধ্যে ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে- এমন হিসাবের সংখ্যা ১লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি। মার্চ শেষে এ ধরনের হিসাব ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। অর্থাৎ তিন মাসে কোটি টাকার হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা।
এর তিন মাস আগে, অর্থাৎ মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট হিসাব ছিল ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টি। তখন এসব হিসাবে জমা ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে ব্যাংক খাতে হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৩৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৭৩টি। একই সময়ে ব্যাংকে আমানত বেড়েছে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।
বিশিষ্ট বাজার বিশ্লেষক, ঢাকা ষ্টক একচেঞ্জের সাবেক চেয়ারম্যান: আহমদ ইকবাল হাসান মনে করেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে সাধারণত দুই ধরনের ব্যবসায়িক ধারা পরিলক্ষিত হয়, তা হলো মেধা ও যোগ্যতা কেন্দ্রিক এবং সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রভাবপুষ্ট। এই দ্বিতীয় ধারায়, মুক্ত ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ নস্যাৎ করে কতিপয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থা কুক্ষিগত করেন, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে-স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।
এর পাশাপাশি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তরা যখন প্রয়োজনীয় ব্যাংক ঋণ পেতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন, তখন বড়-বড় ঋণখেলাপিরা শাস্তির মুখোনুখি হওয়ার বদলে অনায়াসে পার পেয়ে যাচ্ছেন এবং নানাবিধ সুবিদা নিচ্ছেন। যার ফলশ্রুতিতে বংলাদেশে রাতারাতি এক শ্রেণির নব্য কোটিপতির ক্ষতিকর উত্থান হচ্ছে।
এর বাইরে এক শ্রেণির ফটকা ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে কিভাবে কর, ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে সরকারের দৃষ্টি এড়ানো যায়, এজন্যে সরকারকে করনীতিতে সংস্কার আনতে হবে একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ও জবাবদিহিতার আওতায় রাখতে হবে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বিআরবি গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. মজিবর রহমান –এর মতে, ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি থাকা হিসাবের সংখ্যা দিয়ে দেশে কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, এক কোটি টাকার বেশি অর্থ থাকা হিসাবের মধ্যে ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে। সরকারি সংস্থারও এ ধরনের হিসাব থাকতে পারে। আবার একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংক হিসাব খুলতে পারে। ফলে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা এবং কোটিপতি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সব সময়ে এক নয়, তবে এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্বার্থে সরকারকে অবশ্যই কর নীতির আমুল সংস্কার করতে হবে।
সমস্যা সঙ্কুল নানা সংকটের মধ্যে ও একই সময়ে ব্যাঙ্কিং খাতে আমানতের পরিমাণও বেড়েছে উল্লেখ্যযোগ্য হারে। মার্চের শেষের দিকে ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের স্থিতি ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায়। সে হিসাবে এপ্রিল-জুন এই তিন মাসে ব্যাংক খাতে মোট আমানত বেড়েছে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ একদিকে সাধারণ ও মোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের আমানত থাকা হিসাব এবং এসব হিসাবে জমা অর্থ ও বাড়ছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে আমানতের কেন্দ্রীভূত সম্পদ বৈষম্যের বিমর্শ চিত্র নিয়ে বিতর্ক তৈরির পথ খুলছে।
–টিভি টুডে