
-শেখ নূর ইসলাম
কখনো পরীক্ষার রুটিন এগিয়ে আনা, কখনো লটারি পদ্ধতিতে ভর্তির সিদ্ধান্ত, কখনো বা শিক্ষক নিয়োগের প্রচলিত পদ্ধতি বাতিল বিতর্ক, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ বিতর্ক, কখনো ব্লেন্ডেড (অনলাইন ও সশরীরে) শিক্ষা পদ্ধতি, বেসরকারি স্কুল কলেজের কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ ডিসিদের থেকে সরিয়ে ম্যানেজিং কমিটির হাতে তুলে দেওয়া, প্রাথমিক বদলি মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নিয়োগ পরীক্ষা হলেও ভাইবা না নেওয়া, দীর্ঘদিন অ্যাডহক কমিটি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা, কখনো বৃষ্টি-জলাবদ্ধতা প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া আবার কখনো বা শিক্ষক বদলি কিংবা প্রশ্নপত্রের ভুল এভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া আর সর্বশেষ পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে আখ্যা পাওয়া এরকম নানা ধরণের ইস্যুতে সরকারের প্রথম ছয়মাস শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তপ্ত ছিল ক্যাম্পাস থেকে সড়কপথ।
নকল প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানের লক্ষ্যে, হলে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং ১৯ বছরের মধ্যে এসএসসিতে সর্বনিম্ন পাসের হার নিয়ে তৈরি হয় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। এক পর্যায়ে সামনে চলে আসে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি। ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। তবে কেন হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। কিছুটা রাজনৈতিক, কিছুটা অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে হচ্ছে। যারা দায়িত্বে আছেন তারা ঠিকমতো সিদ্ধান্ত নেন না। তাই সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করে শিক্ষা নিয়ে একটা সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তে আসতে হবে’।
দেশের শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড একথা সেকাল বা সমকাল সব কালেই প্রাসঙ্গিক। কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও অংশীজনের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা না হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায়ই স্বাভাবিক। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিচ্ছে। যে কারণে মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়কে আরও ধীরেসুস্থে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে আবারও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের আস্থার সংকটে পড়তে হবে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে।
তবে এতসব অস্থিরতার বিপরীতে শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ও সংস্কারে সরকারের অন্তত তিন ডজন দৃশ্যমান কাজের তোরজোড় চলছে। দলের নির্বাচন ইশতেহার বাস্তবায়ন, শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কল্যাণ, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, কর্মমুখী শিক্ষা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সুযোগ বাড়ানো, ঝরে পড়া রোধ, নকল প্রতিরোধ, প্রণোদনা ও গবেষণায় গুরুত্ব দিয়ে একগুচ্ছ নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এর অনেকগুলো কর্মকাণ্ডই এখন পর্যন্ত শুধুই পরিকল্পনা, পর্যালোচনা শেষে অনুমোদন পাবে এজন্য সময় ও একটা অন্যতম অনুষঙ্গ বটে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ মিলেছে ২ শতাংশ। এ নিয়ে শিক্ষাবিদদের সমালোচনা শুরু হলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে এটি ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
তথ্যপ্রযুক্তির এই বিশ্বে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচিতে পাঁচ বছরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ৪ লাখ ২৬ হাজার ৭৮ শিক্ষককে ট্যাব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২৩ হাজার ৯শ ৯৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত পাঁচটি করে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপনের উদ্যোগও রয়েছে। ইতোমধ্যে ৩২টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই চালু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য চালু হচ্ছে ‘এডু-আইডি’।
শিক্ষার্থীদের মানসিক বিনোদনের লক্ষে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ নামে নতুন বই তৈরির কাজ চলছে। তৃতীয় ভাষা শিক্ষার জন্য পাঠ্যক্রম ও বিভাগ পর্যায়ে ভাষা গবেষণাগার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শারীরিক শিক্ষা বইয়ে যুক্ত হয়েছে সাতটি খেলা।
ছাত্র জীবনেই শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী গড়ে তোলার লক্ষে, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এক লাখ শিক্ষককে পেশাগত উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গত পাঁচ মাসে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন ১ হাজার ৫শ ৫৮ শিক্ষক। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য পৃথক বদলি নীতিমালাও করা হয়েছে। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত প্রায় ৬৪ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা উপবৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনামূল্যে স্কুল পোশাক ও দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকায় আবাসনসহ বিদ্যালয় নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রথম থেকে নবম শ্রেণির ৮১ বিষয়ের ৬ হাজার ৪শ ৮২ কপি বই ব্রেইলে মুদ্রণের কাজ চলছে। পাঁচ মাসে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩০০টি র্যাম্প ও ২হাজার ৫শ ৫টি প্রতিবন্ধীবান্ধব শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য জাতীয় একাডেমির পূর্ণাঙ্গ ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ১০টি দুর্গম উপজেলায় নতুন প্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রকল্পও অনুমোদনের কাজ চলছে।
বর্তমান সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে গবেষণায় গুরুত্ব দিয়ে, গবেষণার সুযোগ বাড়াতে ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈশ্বিক গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। গত পাঁচ মাসে ১শ ৮০টি গবেষণায় ৬শ ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; আরও ২০০ প্রকল্প অর্থায়নের জন্য বাছাই চলছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চট্টগ্রাম, রংপুর ও বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রকল্প চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের জনবল নিয়োগের পাশাপাশি আইন যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর কমেছে ৫ শতাংশ। ৬০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের চাকরিযোগ্য করে গড়ে তোলা ও নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া হল নির্মাণ-সংস্কার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। ইন্টার্নশিপ ও চাকরি মেলার মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্ভাবনী অনুদানে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থী ঋণ এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়ের উদ্যোগ চলমান আছে।
সবুজ বাংলাদেশ ও পরিবেশ সুরক্ষায় ‘ওইয়ান চাইল্ড’ ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচিতে ২৯ হাজার ৬শ ২১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮৮ হাজার ৮শ ৬৩টি গাছ লাগানো হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ লাখ শিক্ষার্থীকে দিয়ে পাঁচ বছরে ২কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের পোষা প্রাণী পালনে উৎসাহ দিতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পোষা প্রাণী ক্লাবের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ‘স্টার্টআপ বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী ধারণা প্রদর্শনী’র মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্ভাবনী কাজে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। দেওয়া হয়েছে ‘উদ্ভাবনী মেধাবী শিক্ষার্থী’ ও ‘সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক’ পুরস্কার। সংসদ টেলিভিশনকে শিক্ষা চ্যানেলে রূপ দেওয়ার বিষয়েও চিন্তাভাবনা আছে।
শিক্ষকদের পেশার অবসানের পর বড় সংকট হাজির হয় জীবিকা নির্বাহে, তার অবসান ঘটিয়ে গত ১৫ আগস্ট থেকে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ হাজার ১শ ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষককে ভাতার আওতায় আনা হওয়েছে।
যে সব স্কুলে যথাযথ ফলাফল বা শিক্ষার্থীদের এসএসসিতে পাসের খাতায় শূন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে সব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে এমপিও বাতিলের সুপারিশ করা হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন পরামর্শক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ছয় মাসে একটি মন্ত্রণালয়ের কাজের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন আসলে করা যায় না। নকল বন্ধে কড়াকড়ি ও শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি ছিল। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের এমপিও হঠাৎ করে বাতিল না করে শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার এবং মানোন্নয়নে একটা ষ্ট্যাণ্ডার্ড সময় দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষার প্রসারে শুধু পাঠ্যবই দিলেই হবে না। বৃত্তিমূলক বা কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহী করতে এটা দরকার। পরবর্তী ধাপে ল্যাব, সরঞ্জাম ও দক্ষ ইনস্ট্রাক্টরও লাগবে। সাধারণ, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার পার্থক্য বুঝে এলাকাভিত্তিক প্রয়োজন নির্ধারণ করে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। হাতেকলমে শিক্ষা না দিলে এই বিপুল বিনিয়োগের ফল শূন্য হবে। সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ১শ ৮০ দিনে শিক্ষা খাতে চেষ্টার ঘাটতি নেই। প্রস্তাবিত পরিকল্পনার কতটা কার্যকর হয় এবং তার সুফল কতটা শ্রেণিকক্ষে পৌঁছায় সেটার ওপরে নির্ভর করবে শিক্ষার সংস্কার কতটা শিক্ষা কল্যাণে এলো।
–টিভি টুডে