
রায়গঞ্জ প্রতিনিধি:
পৌনে তিন ঘণ্টা হাসপাতালের বারান্দায় প্রসূতির প্রসব বেদনায় কান্না, চিৎকার তবুও খোলেনি প্রসূতি বিভাগের তালা। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি বিভাগের কক্ষ তালাবদ্ধ থাকায় চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টা প্রসব যন্ত্রণায় কাতরানোর পর হাসপাতাল থেকে অন্যত্র নেওয়ার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সন্তান প্রসব করেছেন এক নারী।
শনিবার (৮ আগস্ট) দিবাগত রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা ও দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী রঞ্জনা খাতুন রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের কোদলা দিঘর গ্রামের এক হোটেল দিনমজুরের স্ত্রী।
প্রসূতির স্বজনরা বলছে, আনুমানিক রাত ৮টার দিকে প্রসব বেদনা নিয়ে রঞ্জনা খাতুনকে রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। জরুরি বিভাগ থেকে তাকে প্রসূতি বিভাগে পাঠানো হলে সেখানে গিয়ে কক্ষটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পান তারা। সেখানে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক বা মিডওয়াইফকেও পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের।
রঞ্জনার দেবর জাকারিয়া হোসেন বলেন, ‘ওই সময় ভাবির গর্ভের পানি ভেঙে যাচ্ছিল এবং রক্তক্ষরণও হচ্ছিল। তীব্র প্রসব যন্ত্রণায় তিনি হাসপাতালের বারান্দায় কাতরাচ্ছিলেন’। স্বজনেরা চিকিৎসাসেবার জন্য বারবার ডাকাডাকি, অনুরোধ করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাননি বলে জানান। কোনো উপায় না পেয়ে, অন্য ওয়ার্ডের নার্সদের কাছে সহযোগিতা চাইলে তাদের থেকেও দুর্ব্যবহারের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন তারা।
প্রসূতির দেবর জানান, ‘ভাবি না পারছিলেন দাঁড়াতে, না পারছিলেন বসতে। চারপাশ রক্ত ও পানিতে ভেসে যাচ্ছিল। প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টা ধরে ডাকাডাকি চিৎকার করেছি সাহায্যের জন্যে, কিন্তু একটুও নার্সদের মন গলেনি। উল্টো গালমন্দ করে তাড়িয়ে দিয়েছেন। ডাক্তার-নার্সদের মন এতো কঠোর ক্যামনে হয়’, প্রশ্ন ছুড়ে দেন জাকারিয়া।
এক পর্যায়ে প্রসূতি রঞ্জনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে স্বজনেরা তাকে বগুড়ার শেরপুরের একটি হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে রওনা হওয়ার পর পথেই সন্তান প্রসব করেন তিনি। অটোরিকশার ভেতরেই অস্বাস্থ্যকর ও সংকুচিত পরিবেশে শিশুটির জন্ম হয়। এদিকে ঘটনার বিষয়ে কথা না বলতে প্রসূতির পরিবারকে স্থানীয় কয়েকজন ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কথা বলার চেষ্টা করা হয় রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এএফএম ওবায়দুল ইসলামের বক্তব্য জানতে, কিন্তু একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। এমনকি খুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর সাড়া মেলেনি।
সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. নুরুল আমিন ছুটিতে থাকায় দায়িত্বে থাকা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. তাসলিমা জান্নাত বলেন, বিষয়টি তারা সকালে জানতে পেরেছেন। হাসপাতাল থেকে তাকে জানানো হয়েছে, রাতে রোস্টারে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির দায়িত্বে অবহেলার কারণে ঘটনাটি ঘটেছে। এ ঘটনায় একজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে রাস্তায় সন্তান প্রসবের বিষয়টি তাকে কেউ জানায়নি বলে জানান ডেপুটি সিভিল সার্জন।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান ও দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতালে প্রসূতিদের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
–টিভি টুডে