
–শেখ নূর ইসলাম
জীবন সায়াহ্নে মুমূর্ষু রোগীদের জীবন বাঁচাতে হাসপাতালের (Intensive Care Unit) আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র। এটি উন্নত প্রযুক্তি ও জীবন রক্ষাকারী সাপোর্টের (Life-Saving) মাধ্যমে রোগীর একাধিক অকেজো অঙ্গের কার্যক্রম সচল রেখে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার সরবোচ্চ সুযোগ তৈরি করে। এতদসত্বেও এ ইউনিটই এখন অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর সবচেয়ে বড় বিস্তারকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘদিন আইসিইউতে ভেন্টিলেটর বা ক্যাথেটার ব্যবহারের ফলে রোগীরা এমন কিছু মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন, যা সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে সারে না। চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের আরও উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, দেশের হাসপাতালগুলোর আইসিইউতে চিহ্নিত হওয়া জীবাণুর ৮৯ শতাংশই বহু ঔষধ প্রতিরোধী বা (মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট বা এমডিআর)। যার অর্থ দাড়ায়, এসব জীবাণুর বিরুদ্ধে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক সফল কার্যকারিতা হারিয়েছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) পরিচালিত এই জাতীয় নজরদারি জরিপের আওয়তায় দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সংগ্রহীত নমুনা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ পরিস্থিতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বিষয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় নজরদারি কার্যক্রম ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সারভেইল্যান্স বাংলাদেশ ২০২৫’ প্রতিবেদনে ওপরের তথ্য বেরিয়ে এসছে।
‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সারভেইল্যান্স বাংলাদেশ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিইউ থেকে শনাক্ত হওয়া জীবাণুর ৮৯ শতাংশই বহু ওষুধ-প্রতিরোধী (মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট বা এমডিআর)। এর মধ্যে ৪১ শতাংশকে সন্দেহভাজন প্যান-ড্রাগ-প্রতিরোধী (পিডিআর) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, অর্থাৎ এসব জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প ঔষধ অত্যন্ত সীমিত যে জন্য গুরুতর সংক্রমনের চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সংগৃহীত নমুনা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধের জাতীয় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এসকল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয়ভাবে পরীক্ষিত নমুনার ৪৬ শতাংশে এমডিআর জীবাণু পাওয়া গেলেও আইসিইউতে এ হার বেড়ে ৮৯ শতাংশে পৌঁছেছে। একইভাবে সারা দেশে সন্দেহভাজন পিডিআর জীবাণুর হার ৬ শতাংশ হলেও আইসিইউতে তা ৪১ শতাংশ বেড়েছে।
চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীরা সাধারণত ভেন্টিলেটর, ইউরিনারি ক্যাথেটারসহ বিভিন্ন চিকিৎসাযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। পাশাপাশি শুরু থেকেই তাদের শক্তিশালী বিস্তৃত আওতার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। এসব কারণে সেখানে অ্যান্টিবায়োটিক- প্রতিরোধী জীবাণুর টিকে থাকা ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
জাতীয় এএমআর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হাসপাতালজুড়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জীবাণুর মধ্যে এমডিআর অতি মাত্রায় বেড়েছে। মূত্রনালি, রক্ত, ফুসফুস ও হাসপাতাল- সংশ্লিষ্ট সংক্রমন ঘটানো জীবাণুগুলোর মধ্যে এন্ট্রারোক্কাস ফেসিয়ামের উপস্থিতি ৭৪ শতাংশ, অ্যাসিনিটোব্যাক্টারের ৬৫ শতাংশ, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ার ৫৩ শতাংশ এবং ই. কোলাইয়ের ৫২ শতাংশ নমুনা বহু ওষুধ-প্রতিরোধী। এ ছাড়া সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস ও এন্টারোকক্কাস ফেকালিসেও উল্লেখযোগ্য হারে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ শনাক্ত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন, আইসিইউ কেন সবচেয়ে ঝুঁকিতে
ডাক্তারদের দেওয়া ১৫ হাজার ৮৪৪টি চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাসপাতালে ব্যবহৃত মোট অ্যান্টিবায়োটিকের ৪৮ শতাংশই ব্যবহার হয়েছে আইসিইউতে। ওয়ার্ডে ব্যবহার হয়েছে ৪৪ শতাংশ এবং বহির্বিভাগে মাত্র ৮ শতাংশ। অর্থাৎ হাসপাতালে ব্যবহৃত প্রতি দুটি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় একটি ব্যবহার হয়েছে আইসিইউতে।
সারা দেশের হাসপাতালভিত্তিক তথ্যেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শনাক্ত পজিটিভ নমুনার ৭২ শতাংশ এসেছে আইসিইউ থেকে। ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতেও বহু ওষুধ-প্রতিরোধী এবং কার্বাপেনেম-প্রতিরোধী জীবাণুর উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এএমআর সার্ভেইল্যান্স প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যেসব হাসপাতালের আইসিউতে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেশি, সেখানেই ঔষধ প্রতিরোধী জীবাণুর উপস্থিতি বেশি।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইল্যান্স প্রতিবেদনের প্রধান সম্পাদক ও আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভাইরোলজি) অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন হাবীব বলেন, নজরদারির তথ্য অনুযায়ী দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে আইসিইউতে বহু ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর হার এবং বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োগ্রাম বিশ্লেষণে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের সংখ্যা কমে আসছে। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থা শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
বিশেজ্ঞরা বলছেন, শুধু অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করলে সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। হাসপাতালের সংক্রমন প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে। হাতের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, ভেন্টিলেটর ও সেন্ট্রাল লাইনের নিরাপদ ব্যবহার, প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে আলাদা রাখা, হাসপাতালের পরিবেশ ও চিকিৎসা –সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখা এবং দ্রুত প্রতিরোধী জীবাণু শনাক্তের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. আরিফুল বাশার বলেন, দেশে আইপিসির গাইডলাইন থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল। আইসিইউতে অপ্রয়োজনীয় লোকজনের প্রবেশ, স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং যন্ত্রপাতি ও শয্যার যথাযথ নজরদারির অভাবে এক রোগী থেকে অন্য রোগীর শরীরে প্রতিরোধী জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
আইইডিসিআরের মতে, নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের পাশাপাশি বিদ্যমান ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টিওয়ার্ডশিপ (এএসপি) কার্যক্রম জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা, পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ওষুধ নির্বাচন এবং নিয়মিত প্রেসক্রিপশন পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রেসক্রিপশন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ৯০ দশমিক ৯ শতাংশই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ওয়াচ’ শ্রেণির, যা তুলনামূলক শক্তিশালী এবং সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা প্রয়োজন; কারণ, অতিরিক্ত ব্যবহার করলে জীবাণুর মধ্যে দ্রুত প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে সাধারণ সংক্রমণের জন্য সুপারিশকৃত ‘অ্যাকসেস’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছিল মাত্র ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আর সবচেয়ে জটিল সংক্রমণের জন্য সংরক্ষিত ‘রিজার্ভ’ শ্রেণির ব্যবহার ছিল ১ শতাংশেরও কম।
দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক ব্যবহার, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন এবং নির্ধারিত কোর্স শেষ না করার কারণে দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ দ্রুত বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় হাসপাতালের সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে।
বর্তমানে এএমআর নিয়ে নজরদারির বড় অংশই হাসপাতালভিত্তিক, তিনি যোগ করেন। কমিউনিটি পর্যায়ে বিস্তৃত নজরদারি ও তুলনামূলক গবেষণা বাড়ানো গেলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য খাতের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইইডিসিআর অত্যন্ত জরুরি কিছু পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে। হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টিওয়ার্ডশিপ (এএসপি) বা অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ কার্যক্রম জোরাদার করা। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে সঠিক ওষুধ নির্বাচন করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বা সেবন না করা। একই সাথে হাসপাতালগুলোতে সংক্রমন প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থা কঠোর করতে হবে।
-টিভি টুডে