
ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে কেমিক্যাল খাতে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তোলার ওপর জোরগুরুত্ব দিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। কেমিক্যাল খাতে আভ্যন্তরীণ বাজার ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। দেশে তৈরি পোশাক, ঔষধ, চামড়া, বস্ত্র ও প্লাস্টিক শিল্প এখনো ব্যাপকহারে আমদানিনির্ভর কেমিক্যাল কাঁচামালেরে ওপর নির্ভরশীল। এখন শিল্প বাঁচাতে, বিনিয়োগ বাড়াতে, অতিমাত্রায় আমদানি নির্ভরতা কমাতে প্রয়োজন- শিল্পখাতে নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শুল্ককাঠামো সংস্কার সহ সহজে লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি সেবার নিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগসহজ পরিবেশ তৈরি করে একটি সমন্বিত জাতীয় কেমিক্যাল নীতিমালা প্রণয়ন করা অতিব জরুরি বলে মনে করেন, ‘ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘রাসায়নিক নির্ভর রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
শনিবার (২৫ জুলাই) ‘ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ আয়োজিত ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ –এর সভাপতিত্বে রাসায়নিক খাতের বর্তমান অবস্থা চিহ্নিতকরণ এবং উত্তরনে করণীয় নির্ধারণে ‘রাসায়নিক নির্ভর রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে এ সব দাবি তুলে ধরা হয়।
ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম)-এর মহাপরিচালক মোঃ সলিম উল্লাহ এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)-এর সদস্য আবুল ফাতাহ মোঃ বালিগুর রহমান
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন, এস আর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক: আসিফ রাব্বানী|
তিনি বলেন, আমাদের আভ্যন্তরীণ রাসায়ানিক খাতের বাজার ৬-৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, যা প্রতিবছর ১০-১৫% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ৬.২ বিলিয়ন ডলারের রাসায়ানিক আমদানি করেছে, যার বেশির ভাগই তৈরি পোষাক, ঔষধ ও চামড়া খাতে ব্যবহৃত হয়| তবে এখাতের লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা, উচ্চ শুল্ক হার, অপ্রতুল অবকাঠামো এবং কার্যকর সাপ্লাইচেইনের অভাব অন্যতম প্রতিবন্ধকতা বলে তিনি উল্লেখ করেন, সেই সংশ্লিষ্ট নীতিমালার যুগোপযোগীকরণে পাশাপাশি নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান|
স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া এবং ঔষুধের শিল্পের রপ্তানি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় টিকে থাকার বিষয়টি বহুলাংশেই রাসায়নিক পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সাপ্লাইচেইনের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল| তবে দেশের শিল্পখাতে ব্যবহৃত রং, রাসায়নিক এবং বিশেষায়িত শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল প্রভৃতির আমদানি নির্ভরতা, শুল্ক জটিলতা, পরিবেশগত অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা আমাদের সামগ্রিক শিল্পের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে উল্লেখ করেন ডিসিসিআই সভাপতি| সেই সাথে দেশের রপ্তানিখাতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে সক্ষমতা বাড়াতে একটি কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়ন কোন ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত বাধ্যবাধকতা বলে মত প্রকাশ করেন তাসকীন আহমেদ|
বিআইএম-এর মহাপরিচালক মোঃ সলিম উল্লাহ বলেন, সরকারের শিল্প নীতিমালা সংষ্কারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে, তাই রাসায়নিক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উন্নয়নে কি আলাদা নীতিমালা প্রয়োজন অথবা বিদ্যমান শিল্প নীতিতে একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করলেই চলবে, সে বিষয়ে উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্ত সরকারকে জানানো হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে| দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়নে বিশেষকরে দক্ষ জনবল ˆতরিতে সরকার ও বেসরকারিখাতের একযোগ কাজ করার উপর তিনি জোরারোপ করেন|
বিসিএসআইআর-এর সদস্য আবুল ফাতাহ মো: বালিগুর রহমান বলেন, শিল্প ও শিক্ষাখাতের মধ্যকার সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন| বিসিএসআইআরের গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল ও উৎপাদিত পণ্য ব্যবহারের জন্য শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান| তিনি বলেন, হালকা প্রকৌশল শিল্পে আমাদের বাজার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার, তবে এর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত সহ সহায়ক নীতি সহায়তা প্রদান একান্ত অপরিহার্য|
সেমিনারে উপস্থিত নির্ধারিত বক্তৃতায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউল হক, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)-এর চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই)-এর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি এম. মোসাদ্দেক হোসেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ)-এর পরিচালক ড. মো. আক্তার হোসেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের পরিচালক ও প্রধান ˆবজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ইয়াসমিন নাহার জলি, বাংলাদেশ এগ্রো-কেমিক্যাল ম্যানুফেকচার্স এসোসিয়েশন (বামা)—এর সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর দ্বিতীয় সচিব (শুল্ক, রপ্তানি ও বন্ড) সুরাইয়া সুলতানা, বিজিএমইএ’র পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ, বিকেএমইএ’র পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান এবং ডাইস্টার সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেডের কান্ট্রি ম্যানেজার মো. মাজাহারুল ইসলাম সুমন প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন|
সেমিনারে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিকেএমইএ’র পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, তৈরি পোষাক খাতে সহায়ক নীতি সহায়তার কারণে এখাতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উন্নয়নের ফলে ব্যবসা পরিচালনা সহজতর হয়েছে এবং রাসায়ানিক শিল্পখাতেও এই ধারাবাহিকতা অনুসরণ করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ আরো সম্প্রসারিত হবে| শিল্পখাতে নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানী ও নীতি সহায়তা, রাসায়নিক উৎপাদনে আন্তর্জাতিক মান বাজায়ে রাখা এবং বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল তৈরির কোন বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন।
বিজিএমইএ’র পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ বলেন, দেশে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর কেমিক্যাল ইকো-সিস্টেম তৈরি, দক্ষ জনবল ও গবেষণা কার্যক্রম বাড়ানোর উপর জোরারোপ করেন
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আক্তার হোসেন বলেন, এপিআই শিল্পপার্কের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগের শিথীলতার কারণে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন|
বামা’র সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এগো-কেমিক্যাল শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ হারের কারণে এখাতে সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না, তাই নীতিসহায়তা নিশ্চিতের কোন বিকল্প নেই|
ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বলেন, চামড়া খাতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের বেশিরভাগই আমদানি নির্ভর, তাই আমদানি পর্যায়ে বিদ্যমান শুল্ক কমানো প্রয়োজন|
এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (শুল্ক, রপ্তানি ও বন্ড) সুরাইয়া সুলতানা জানান, রাসায়নিক খাতে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে বিদ্যমান শুল্কাহার ক্রমান্বয়ে হ্রাস করা হচ্ছে এবং বন্ডেড ওয়ারহাউস লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া পুরোটাই অনলাইন ব্যবস্থাপনা চালু হয়েছে, এর সুফল শীঘ্রই উদ্যোক্তারা ভোগ করতে পারবেন|
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, কেমিক্যাল ব্যবহারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, শিল্পখাতে কোনভাবেই ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ব্যবহার করা যাবে না, অন্যথায় অর্থনীতিতে গতি আসলেও মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে|
সেমিনারের মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআই’র প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুস সালাম এবং ডিসিসিআই সদস্য এম এস সিদ্দিকী অংশগ্রহণ করেন|
ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মোঃ সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ সহ রাসায়নিক সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারিখাতের প্রতিনিধিবৃন্দ সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন|
-টিভি টুডে