
দেশের রফতানিমুখী প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের টেকসই কার্যক্রম নিশ্চিত করতে, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমানো এবং তীব্র গ্যাস-জ্বালানি ও আর্থিক সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জরুরি ১০ দফা নীতিগত সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।
বুধবার (১৫ জুলাই) বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বস্ত্রখাতের টেকসই উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি হ্রাস, খেলাপি ঋণ বা এনপিএল বৃদ্ধি রোধ, শিল্পে তারল্য ফিরিয়ে আনা এবং রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যাংক ঋণের কার্যকর সুদহার পুনরায় সহনীয় মার্জিনে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেন। এছাড়া ইডিএফ সম্প্রসারণ এবং গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে দেওয়া বিটিএমএ চিঠিতে উল্লেখ্য করেছেন যে, বর্তমানে তাঁদের সদস্যভুক্ত এক হাজার ৮৮৩টি যার মধ্যে স্পিনিং, উইভিং, ডাইং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং মিল পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রায় ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বেসরকারি বিনিয়োগ রয়েছে। এখানে উল্লেখ্যে যে, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত থেকে এবং এ খাতে প্রায় ৭০ শতাংশ স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মূল্য সংযোজন হয়। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও কাঁচামালের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের কারণে এই খাতের অধিকাংশ মিল বর্তমানে গভীর আর্থিক সংকটে রয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে একদিকে যেমন খেলাপি ঋণ বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিও মারাত্মক আকার ধারণ করছে।
এছাড়া জাতীয় জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ১৩ শতাংশ। প্রতি বছর প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের সুতা ও কাপড়ের আমদানি প্রতস্থাপন করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে এই খাত। একই সঙ্গে প্রথক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবিকা এই শিল্পের সাথে জড়িত।
বিটিএমএ প্রেরিত চিঠিতে উল্লেখ্য করেছে, বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক সংকট, গ্যাস ও জ্বালানি সংকত, ব্যাংক ঋণের উচ্চ স্বুদ, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, এবং চলতি মূলধনের ঘাটতির কারণে টেক্সটাইল মিলগুলো চরম আর্থিক সংকটে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে।
কারখানার উৎপাদন কমে গেলেও শ্রমিকদের মজুরি ও ব্যাংকের কিস্তির মতো স্থায়ী খরচ সচল রাখতে গিয়ে অনেক কারখানার মূলধন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। যার ফলে অনেক কারখানা বন্ধ বা আংশিক সচল রয়েছে, এতে করে ব্যাংকখাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিটিএমএ শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সংরক্ষণের লক্ষ্যে জাতীয় শিল্পনীতি-২০২২ এর আলোকে তাদের ১০টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বন্ধ মিল ও চলতি মূলধনের প্রাক-অনুমোদন ঋণসুবিধার সময়সীমা বৃদ্ধি, জিটিএফ তহবিলের আকার বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব জিরো লিকুইড ডিসচার্জ (জেডএলডি) প্ল্যান্টকে বিশেষ অর্থায়নের আওতায় আনা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা ও আর্থিক পুনর্গঠনের আবেদন দাখিলের সময়সীমা ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির আওতায় দেশীয় মিলগুলোর সরবরাহ করা সুতা ও ফেব্রিকের বিল সর্বোচ্চ সাত কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারির দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া ঋণের শ্রেণিকরণে ওভারডিউ কিস্তির সংখ্যা বর্তমান তিনটির পরিবর্তে আগের মতো ছয়টিতে নির্ধারণ করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আরও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের মধ্যে সংযুক্তি রয়েছে ইডিএফের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সীমা ২০ মিলিয়ন ডলারের পরিবর্তে গত ১২ মাসে প্রত্যাবাসিত রপ্তানি আয়ের ৬৫ শতাংশ নির্ধারণ করা এবং ইডিএফ ঋণের সুদহার পুনরায় ২ শতাংশে নামিয়ে আনা। এর পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে চলমান জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীদের এলসি ও বিল নিষ্পত্তিতে সৃষ্ট বাধা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
এ সময় বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল দৃঢ়ভাবে জানান যে, প্রচ্ছন্ন রপ্তানিমুখী (ডিমড এক্সপোর্ট) শিল্পের জন্য প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং বিশেষায়িত অঞ্চলের জন্য নগদ সহায়তা পুনর্বহালসহ এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প পুনরুজ্জীবিত হয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি মনে করেন।