


দীর্ঘ বিরতির পরে নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সরবোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। তবে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বাড়বে না, এমনই তথ্য মিলেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে। নিম্ন গ্রেডের চাকরিজীবীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানো হতে পারে। এরই মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। দীর্ঘদিন পর বেতন বাড়ানোর উদ্যোগকে যৌক্তিক বললেও, এটি বাস্তবায়িত হলে মূল্যস্ফীতি, আয়বৈষম্য ও ব্যাংকিং খাতের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
সম্প্রতি জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির সভায় এবিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে আগামী সপ্তাহে কমিটির আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সচিব কমিটির সুপারিশ পরের সপ্তাহে মন্ত্রীসভায় উঠবে। অনুমোদন মিললে গেজেট জারির পর নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে। তবে মন্ত্রীসভা চাইলে সুপারিশ পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন করতে পারবে।
চলতি নতুন কাঠামোয় শুধু মূল বেতন নয়, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি অবসরকালীন সুবিধা ও পেনশন ব্যবস্থাও রয়েছে পর্যালোচনার আওতায়।
কমিশনের লক্ষ্য, ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত এবং ১০ম থেকে ২০ তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন ৯০ হেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। অথচ বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় অপরিবর্তিত থাকবে।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এরপর প্রতিবছর পাঁচ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও নতুন পে-স্কেল ঘোষণা হয়নি। গত বছর গঠিত বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সুপারিশ করে। বর্তমানে সরকার সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করে নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করছে। তাতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারশ রয়েছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়তে পারে বলে খসড়া থেকে জানা গেছে। অনুমোদন শেষে চলতি মাসেই নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রায় এক দশক পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন ছিল। তবে এমন সময়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যখন দেশের মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে সরকারকে ঋণ নিতে বা বিকল্প উৎস থেকে অর্থ জোগাড় করতে হতে পারে, যা অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
তাদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে বাজারে ভোগব্যয়ও বাড়বে। কিন্তু সেই অনুপাতে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চাহিদা বাড়লে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্য বাড়িয়ে দেন। ফলে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এখানে উল্লেখ্য যে, সরকারি খাতে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পেলেও দেশের অধিকাংশ কর্মজীবী মানুষ বেসরকারি খাতে কর্মরত। তাদের আয় না বাড়লে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আয়বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব দারিদ্র্যের ওপরও যে পড়বে না সে আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ খাতে মোট বরাদ্দ এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে সরকার যদি দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তাহলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তবে সরকার বলছে, অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে নতুন বেতন কাঠামো একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম পর্যায়ে মূল বেতন বাড়ানো হবে, পরে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ভাতা কার্যকর করা হবে।